ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ এখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার ফলে কর্মজীবনেও দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি এবং কর্মী এই পরিবর্তনের জন্য মানসিকভাবে বা কাঠামোগতভাবে প্রস্তুত নয় বলে মনে করেন প্রিন্সিপাল ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের সিইও ডিনানা স্ট্রাবল।
স্ট্রাবলের মতে, জন্মহার কমে যাওয়ায় নতুন তরুণদের তুলনায় অভিজ্ঞ বয়স্ক কর্মীদের সংখ্যা শ্রমবাজারে বাড়ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইইউ-এর ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে রেকর্ড দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মসংস্থানে ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোকে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, কাজের ধরন এবং ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে থাকা কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্ট্রাবলের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রতিষ্ঠান 'প্রিন্সিপাল' বর্তমানে তাদের ১৯ হাজার কর্মীকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং আইটি, অ্যাকাউন্টস ও ফিন্যান্সের মতো বিভাগে রোটেশন প্রোগ্রাম চালু করেছে, যাতে কর্মীরা প্রতিষ্ঠান না ছেড়ে নতুন নতুন ভূমিকায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন।
দীর্ঘায়ুর এই নতুন বাস্তবতায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য। ইউরোপের নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে চার বছর কম বেতনভুক্ত কাজ করেন, অথচ তারা পুরুষদের চেয়ে পাঁচ বছর বেশি বাঁচেন। ফলে অবসরকালীন পেনশনের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের চেয়ে গড়ে ২৪.৫% কম অর্থ পান, যা বর্তমানের জেন্ডার পে গ্যাপের চেয়েও দ্বিগুণ। নারীরা সাধারণত পরিবারের যত্ন নিতে বা সন্তান পালনে ক্যারিয়ারে বিরতি নেন এবং পার্ট-টাইম কাজ বেশি করেন, ফলে তাদের সঞ্চয় কম হয়। বর্তমানে ইইউ-তে জন্মগ্রহণকারী একজন নারীর গড় আয়ু ৮৪ বছর এবং শতাব্দীর শেষে তা ৯০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে সীমিত সঞ্চয় দিয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।
অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র বা নিয়োগকর্তাদের বদলে ব্যক্তির ওপর স্থানান্তরিত হচ্ছে। প্রিন্সিপাল ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ইনডেক্স অনুযায়ী, মাত্র ২৯% ইউরোপীয় নারী বিশ্বাস করেন যে সরকারি পেনশন ব্যবস্থা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এই বিশ্বাস ৩৯%। জার্মানিতে নারীদের মধ্যে এই আস্থা মাত্র ১৭%। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর জোর দিলেও অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয়ের পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়েই থেকে যায়।
এই সংকট মোকাবিলায় স্ট্রাবল 'অটো-এস্কেলেশন' পদ্ধতির সুপারিশ করেছেন, যেখানে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে সঞ্চয়ের হারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। এছাড়া নারীদের জন্য পেশাদার আর্থিক পরামর্শের অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করেন, ফলে বিধবা নারীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। লিভারপুল ভিক্টোরিয়ার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৪১% নারী তাদের সঙ্গীর মৃত্যুর পর পারিবারিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় আত্মবিশ্বাসী নন। এই সমস্যা সমাধানে প্রিন্সিপাল এখন দম্পতিদের উভয়ের সাথেই সম্পর্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দেয়। পরিশেষে, স্ট্রাবল মনে করেন, এমন একটি কর্মসংস্কৃতি তৈরি করা যেখানে কর্মীরা দীর্ঘকাল থাকতে আগ্রহী হবেন, তা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে কাজ করবে।




