আমেরিকার শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে একটি গোপন পথ বা 'ব্যাকডোর' ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা সাধারণ আবেদনকারীদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। এই বিশেষ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে 'জেড-লিস্ট' (Z-List)। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সাধারণ আবেদনপত্রে এই তালিকার কোনো উল্লেখ নেই। তবে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সংখ্যক আবেদনকারীকে এই তালিকার মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। এই তালিকার বিশেষত্ব হলো, নির্বাচিতদের সরাসরি মূল ক্লাসে ভর্তি না করে এক বছর অপেক্ষা করার শর্তে ভর্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

অভিযোগ উঠেছে যে, এই বিশেষ তালিকার মাধ্যমে মূলত অতি-ধনী দাতা, প্রভাবশালী প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সন্তানদের সুযোগ করে দেওয়া হয়। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের একাডেমিক যোগ্যতা সাধারণ পথে ভর্তি হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তবুও এই গোপন পথের মাধ্যমে তারা সুযোগ পেয়েছেন। দীর্ঘকাল ধরে অভিজাত কলেজগুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় এই ধরণের বিশেষ সুবিধা প্রচলিত থাকলেও ২০২৩ সালের জুনে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। আদালত যখন জাতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে (Affirmative Action) ভর্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—জাতিগত পরিচয় বিবেচনা করা নিষিদ্ধ হলে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সন্তানদের (Legacy Admissions) কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে?

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে হার্ভার্ডের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সন্তানদের প্রায় ৩৪ শতাংশ সুযোগ পেয়েছেন, যেখানে সাধারণ আবেদনকারীদের সুযোগ পাওয়ার হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এই বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রয়োজনকে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আনুগত্যকে অনুদানের উৎসে পরিণত করে গবেষণার খরচ এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে সমালোচকদের মতে, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও হার্ভার্ড এই প্রথা ছাড়ছে না। জনস হপকিন্স তাদের বংশগত অগ্রাধিকার বাতিল করার কয়েক বছর পর মাইকেল ব্লুমবার্গের কাছ থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের অনুদান পেয়েছিল, যার বিনিময়ে কোনো বিশেষ ভর্তির সুযোগ চাওয়া হয়নি।

এদিকে, হার্ভার্ডের এই প্রথার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীগুলো ফেডারেল অভিযোগ দায়ের করেছে এবং মার্কিন শিক্ষা বিভাগ একটি তদন্ত শুরু করেছে। তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই প্রক্রিয়া 'পর্যালোচনা' করার কথা বললেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি। এছাড়া, করমুক্ত দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে হার্ভার্ডের এই ধরণের 'প্রতিদানমূলক' সুবিধা ট্যাক্স আইনের পরিপন্থী কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়া ইতোমধ্যে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ধরণের সুবিধা নিষিদ্ধ করেছে, যদিও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে এই প্রথা বজায় রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হার্ভার্ড উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি পথপ্রদর্শক প্রতিষ্ঠান। এখানে পরিবর্তন এলে অন্যান্য অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তা অনুসরণ করবে। তাই জন্মগত সুযোগ বা বংশ পরিচয়কে ভর্তির মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যদি অত্যন্ত বড় অংকের অনুদান যারা দেন, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হয়, তবে তা যেন অত্যন্ত সীমিত এবং স্বচ্ছ হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও হার্ভার্ড যেভাবে বংশগত সুবিধা চালু রেখেছে, তা প্রমাণ করে যে এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ধনীদের জন্য 'অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন' বা বিশেষ সুযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী।