পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে তেল পরিবহনের ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর আর্থিক প্রাপ্তিও। ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার হুমকির মুখেও বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচল অব্যাহত রয়েছে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সুরক্ষা এবং বিকল্প পাইপলাইনের সহায়তায় তেলের প্রবাহ যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরে এসেছে, তবে বৈশ্বিক তেল বাজারের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে ইরান সম্প্রতি প্রণালীর বাইরেও জাহাজগুলোর ওপর হামলা জোরদার করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে অনেক জাহাজ এখন ছোট ছোট ট্রিপ বা 'শাটল রান' দিচ্ছে, যেখানে মাঝপথে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানো হচ্ছে।
এই চরম ঝুঁকির মুখে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিশাল অংকের অর্থ। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের জন্য একজন ট্যাঙ্কার ক্যাপ্টেনের মাসিক বেতন এখন ১ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যার সাথে প্রতি ট্রিপে আরও ৫০ হাজার ডলার বোনাস দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাদের নিয়মিত বেতন ছিল মাত্র ১৫ হাজার ডলার। একইভাবে সাধারণ নাবিকদের মাসিক বেতন যেখানে গড়ে ১,৫০০ ডলার, সেখানে হরমুজের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে তাদের আয় স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে ছয় গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এই বিপুল অর্থ বা 'বিপদ ভাতা' না দিলে জাহাজ মালিকরা দক্ষ কর্মী পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দক্ষিণ লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগর এলাকাতেও এই ধরনের ভাতা দেওয়া হচ্ছে, তবে হরমুজের তুলনায় তা কিছুটা কম। কিছু ক্ষেত্রে নাবিকদের এই বিপজ্জনক কাজে থাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই উচ্চ উপার্জনকে 'ভাড়াবাজ যোদ্ধা' বা মার্সেনারিদের সাথে তুলনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৯৩টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু কর্মীদের বেতন নয়, জাহাজ মালিকদের বীমা খরচও ব্যাপক বেড়েছে। যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কারণে একটি জাহাজের মূল্যের ৬% থেকে ১০% পর্যন্ত বীমা প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে, যা একটি সুপারট্যাঙ্কারের ক্ষেত্রে ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে সামগ্রিক শিপিং খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহনের দৈনিক ভাড়া যেখানে গত বছর ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার ছিল, তা এখন রেকর্ড ১.৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ট্যাঙ্কারের সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভাড়া আকাশচুম্বী হয়েছে। শিপব্রোকার গিবসনের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে একটি ট্যাঙ্কার ভাড়ার খরচ প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার, যা একটি স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯ রকেটের উৎক্ষেপণ খরচের (৭৪ মিলিয়ন ডলার) চেয়েও বেশি। বিশেষজ্ঞ এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াই-এর মতে, ১৯৬০-এর দশকে সুপারট্যাঙ্কারের প্রবর্তনের পর থেকে মুদ্রাস্ফীতির হিসাব করার পরেও বর্তমানে ভাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন তেল উৎপাদনকারী এবং পণ্য ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ট্যাঙ্কার কেনার কথা ভাবছেন। তবে এই অতিরিক্ত খরচ তেলের মুনাফায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় রিফাইনার রেপসোল-এর মুনাফা তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যারেল প্রতি ৩৬ ডলার থেকে অক্টোবরে নেমে ১৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি কূটনৈতিক সমাধান না পায়, তবে তারা আঞ্চলিক তেল পরিকাঠামো, যেমন ড্রিলিং এবং রিফাইনিং কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে আরও বড় ধরনের সংঘাত শুরু করতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের সিইও এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিডজ।




