গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা 'ধাঁধার চর' এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে ৪৫ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন বিএনপির সাবেক এক নেতা, কামাল জামান মোল্লা। এই প্রকল্পের জন্য তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে ২৩৯.৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের আবেদন জানিয়েছেন। তার এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে 'সাননোভা এনার্জি ওপিসি' নামক প্রতিষ্ঠান, যার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। উল্লেখ্য, কামাল জামান মোল্লা শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সম্প্রতি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াই করায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
আবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং সবুজ শক্তির প্রসারে এই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নেদারল্যান্ডস থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং চীন ও কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে। তবে আবেদনকৃত জমির শ্রেণি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর একটি বড় অংশই নদী, নাল এবং সিকস্তি শ্রেণির জমি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশ নাল শ্রেণির, ১৯ শতাংশ সিকস্তি, ১৩ শতাংশ নদী এবং ৬ শতাংশ বালুচর।
এই প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ূবী। তিনি জাতীয় সংসদে এই চরটিকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছিলেন। তার মতে, এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে প্রচুর গাছপালা কাটা পড়বে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। পরিবেশবাদী সংগঠন 'বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন'-এর চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন জানান, এই চরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ এবং বিরল উদ্ভিদ রয়েছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জমি বন্দোবস্ত দিলে এই জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তার পরামর্শ, এটিকে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার স্পষ্ট করে বলেছেন, আইন অনুযায়ী নদী বা নাল শ্রেণির জমি ইজারা দেওয়া নিষিদ্ধ। কোনো জমি পরিত্যক্ত থাকার অজুহাতে তা ব্যক্তিগতভাবে হস্তান্তর করা যায় না। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৫ সালের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নদী, খাল, নালা বা পার্কের মতো সংরক্ষণীয় জমি বন্দোবস্তের আওতায় আসবে না।
অন্যদিকে, উদ্যোক্তা কামাল জামান মোল্লা দাবি করেছেন, তিনি কোনো কৃষিজমি বা নদীর জমি ইজারা চাননি, বরং পরিত্যক্ত খাসজমির জন্য আবেদন করেছেন। তার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি রিসোর্ট নির্মাণের চিন্তাও রয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূইয়া জানিয়েছেন, আবেদনটি প্রাপ্ত হয়েছে এবং তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে জমিটি ইজারা দেওয়া সম্ভব কি না। কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করছেন।




