জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদ সদস্যদের ভেতরে দায়িত্ব ও আচরণের কথা থাকলেও, সংসদের বাইরে একজন জনপ্রতিনিধির নৈতিক আচরণ, দায়-দায়িত্ব এবং স্বার্থের সংঘাত নিরসনে কোনো পৃথক আইন বা আচরণবিধি নেই। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর এই আইনি শূন্যতা আবারও আলোচনায় এসেছে। ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দল থেকে বহিষ্কৃত এই সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর পর পুলিশ তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তার করেছে এবং বর্তমানে তিনি রিমান্ডে রয়েছেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি তৈরির আহ্বান জানিয়েছে। টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে আক্ষেপ করে বলেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের তথ্য বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে বারবার উঠে এলেও প্রতিকারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে টিআইবি-র একটি গবেষণায় নবম সংসদের ১৪৯ জন সদস্যের মধ্যে ১৪৪ জনই (৯৭ শতাংশ) প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মতো নেতিবাচক কাজে জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে এই ধরনের আইন করার প্রচেষ্টা অতীতে দুইবার চালানো হয়েছে, তবে তা সফল হয়নি। ২০০৩ সালে বিএনপি আমলের অষ্টম সংসদে সদস্য আবদুল মান্নান 'দ্য মেম্বার অব পার্লামেন্ট (কোড অব কনডাক্ট) বিল-২০০৩' শিরোনামে একটি বেসরকারি বিলের নোটিশ দেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ আমলের নবম সংসদে সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী 'সংসদ সদস্য আচরণ বিল' উত্থাপন করেন। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো আইনে রূপ নেয়নি। এই বিলগুলোতে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান, আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা এবং একটি সংসদীয় 'নৈতিকতা কমিটি' গঠনের প্রস্তাব ছিল।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, সংসদ সদস্যরা অন্যদের জন্য আইন করলেও নিজেদের জন্য কোনো সীমারেখা টানতে আগ্রহী নন, যার ফলে এই ধরনের বিলগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি বা 'কোড অব কন্ডাক্ট' বিদ্যমান।
বর্তমান সময়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং ৩০টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে তৈরি 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এও সংসদ সদস্যদের অধিকারের সীমা ও দায় নির্ধারণের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এই বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আলোচনা না হলেও সবাই চাইলে আচরণবিধি প্রণয়ন করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, সংসদ সদস্যরা সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করবেন এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকাই হবে জনগণের প্রত্যাশা।




