সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক 'ড্রিমফোর্স' কনফারেন্সের ফাঁকে এক সাক্ষাৎকারে সেলসফোর্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক বেনিঅফ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বেনিঅফ মনে করেন, এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের তৈরি করা প্রযুক্তির ঝুঁকির জন্য দায়বদ্ধ থাকতে হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শুরুর দিকের ভুলগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্যের দায়িত্ব নিতে হবে। এই প্রসঙ্গে তিনি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ধারণা 'কুলেআনা'-র কথা উল্লেখ করেন, যা তিনি সেলসফোর্সের করপোরেট সংস্কৃতিতেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

এই সম্মেলনে এআই নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্যে মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান জুলাই মাসে 'হাগিং ফেস'-এ ঘটে যাওয়া হ্যাকিংয়ের ঘটনাকে একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, প্রযুক্তির সক্ষমতার চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেমিও এই মতামতে একমত হয়েছেন। তবে এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এবং মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। হুয়াংয়ের মতে, গতি এবং নিরাপত্তা একই সাথে বজায় রাখা সম্ভব। অন্যদিকে জাকারবার্গ মনে করেন, এআই ল্যাবগুলোর নিজস্ব প্রেষণা রয়েছে নিরাপদ প্রযুক্তি তৈরির জন্য।

বেনিঅফ সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণের কথা না বললেও জানান, পণ্য দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলো জবাবদিহিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর কথা বলেন, যাদের গাড়িতে ত্রুটি থাকলে তারা আইনিভাবে দায়ী থাকে। তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, ফরচুন ৫০০ তালিকার মতো একটি নতুন তালিকা তৈরি করা উচিত, যেখানে কোম্পানিগুলোকে তাদের নৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে র‍্যাঙ্কিং করা হবে। এক্ষেত্রে তিনি অ্যাপল-কে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন।

সেলসফোর্সের নিজস্ব কৌশল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বেনিঅফ জানান, তারা তাদের এআই মডেলগুলোকে একটি 'ট্রাস্ট লেয়ার' বা বিশ্বাসের স্তরে আবদ্ধ রেখেছে, যাতে মডেলগুলো অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করতে না পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, সেলসফোর্স নিজে কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী 'ফ্রন্টিয়ার মডেল' তৈরি করছে না, বরং অন্যান্য ল্যাবগুলোর মডেল ব্যবহার করে তাদের 'এজেন্টফোর্স' পণ্যটিকে আরও উন্নত করছে। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের কারণে একদিকে যেমন অ্যানথ্রোপিক বা ওপেনএআই-এর স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলো সেলসফোর্সের মূল ব্যবসার জন্য হুমকি হতে পারে, অন্যদিকে তাদের প্রযুক্তির মাধ্যমে সেলসফোর্স লাভবানও হচ্ছে।

ব্যবসায়িক দিক থেকে সেলসফোর্স বর্তমানে একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত 'পার-সিট' বা আসনভিত্তিক ক্রয় ব্যবস্থার পরিবর্তে গ্রাহকরা এখন নতুন মডেল খুঁজছেন। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে কোম্পানির রাজস্ব ও মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যানথ্রোপিকে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা দ্বিতীয় অর্থবছিকে ২.৬ বিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। চাকরির বাজারে এআই-এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বেনিঅফ জানান, সেলসফোর্সে বর্তমানে ৮৩ হাজারেরও বেশি কর্মী কর্মরত, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যা।

ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বেনিঅফ জানান, তিনি সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে এআই নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেননি। উল্লেখ্য, ট্রাম্প সম্প্রতি এআই-এর ধ্বংসাত্মক পরিণতির আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এছাড়া সান ফ্রান্সিসকোর স্থানীয় রাজনীতি ও বিক্ষোভের বিষয়ে বেনিঅফ কিছুটা হালকা মেজাজে বলেন, বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি সান ফ্রান্সিকোরই বৈশিষ্ট্য এবং এটি শহরের জীবন্ত পরিচয়ের অংশ।