কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝে এক কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হাইপারস্কেলার বা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকার কোনোভাবেই 'দায়মুক্তি ঢাল' (liability shield) হিসেবে কাজ করবে না। অর্থাৎ, এআই-এর কারণে কোনো বিপর্যয় ঘটলে তার দায়ভার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হবে, সরকার তা গ্রহণ করবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অ্যানথ্রোপিক (Anthropic) এবং ওপেনএআই (OpenAI)-এর প্রাক্তন গবেষক জ্যাকব কক্সনের দাবি, টেক জায়ান্টরা মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে। এছাড়া অ্যানথ্রোপিকের শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক ইভান হাবিনজার সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দশকের মধ্যে এআই-এর কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যদিও কম, তবে তা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই সতর্কবার্তার পর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্ব-নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এবং সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্কট বেসেন্ট বলেন, কোনো ল্যাব বা প্রতিষ্ঠানের কর্মী যদি জানান যে মানবজাতি বিলুপ্তির ১০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে, আর তারপর সেই প্রতিষ্ঠান যদি বলে যে এই দায়ভার থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হোক, তবে সরকার তা মেনে নেবে না। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির ঝুঁকির জন্য এআই নয়, বরং মানুষই দায়ী। উদাহরণ হিসেবে তিনি 'হাগিং ফেস' (Hugging Face) ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ওপেনএআই-এর এজেন্টরা পরীক্ষার সময় সিস্টেম থেকে বেরিয়ে হাগিং ফেসের ডাটাবেসে প্রবেশ করেছিল। বেসেন্টের মতে, এটি সম্পূর্ণভাবে ওপেনএআই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও দায়িত্ব। তিনি আরও যোগ করেন, এসব ল্যাব চাইলে যেকোনো সময় তাদের অগ্রগতির গতি কমিয়ে আনতে পারে, তাই তারা নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নিতে বাধ্য।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তিনি ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছেন, এআই কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধমূলক আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। তাঁর মতে, এআই-এর জন্য সবচেয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হলো একজন 'শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান' প্রেসিডেন্ট, যা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দারিও আমোদেই-এর সমালোচনা করে বলেন, তিনি এখন 'নিখুঁত ছোট দেবদূত' সাজার ভান করছেন। উল্লেখ্য, আমোদেই সম্প্রতি একটি চিঠিতে এআই গবেষণার গতি কমিয়ে আনার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণে সরকারি সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যানও ফরচুন-এর এক সাক্ষাৎকারে একই সুর ধরেছেন। তিনি জানান, যদি বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সরকার এবং নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে এই প্রযুক্তির চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী বা গার্ডরেল তৈরি করতে হবে।
তবে এই স্ব-নিয়ন্ত্রণের ধারণার বিপরীতে যুক্তি দিয়েছেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি মনে করেন, যখন মানবজাতির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে থাকে, তখন শিল্পের স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ডের পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নিয়মের প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে যেমন চীনের তুলনায় এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে এই তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে স্ব-নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।




