প্রযুক্তির দ্রুত উৎকর্ষের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়। এই ভয়টি নতুন নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে প্রাচীন গ্রিক মিথ ও দর্শনে। হোমারের 'দ্য ওডিসি'-তে বর্ণিত সাইরেনদের মোহময় ডাকের কথা মনে পড়ে, যা মানুষকে প্রলুব্ধ করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত। বর্তমান সময়ে চ্যাটবট বা এআই-এর সহজ সমাধানগুলো অনেকটা সেই সাইরেনের ডাকের মতো, যা মানুষকে প্রলুব্ধ করে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অনেকেই কর্মক্ষেত্রে গোপনে এআই ব্যবহার করেন এবং একে 'প্রতারণা' হিসেবে অভিহিত করেন। এই অনুভূতির পেছনে প্রধান কারণ হলো 'ইম্পোস্টর সিনড্রোম' বা নিজের যোগ্যতার অভাবের ভয়। ব্যবহারকারীরা শঙ্কিত থাকেন যে, যদি এই প্রযুক্তি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে তারা কি আগের মতো দক্ষ বা বুদ্ধিমান থাকবেন? এছাড়া এখানে চরিত্রের দৃঢ়তার প্রশ্নও সামনে আসে। মানুষ কি এআই-এর দেওয়া প্রথম আউটপুটটিই কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই গ্রহণ করে নিচ্ছে? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'কগনিটিভ অফলোডিং' বা মানসিক ভার লাঘব করা, যেখানে বাইরের যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে মানুষ তার নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীল বিচারবুদ্ধির চর্চা কমিয়ে দিচ্ছে।
ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর কলামিস্ট জন বার্ন-মারডক এবং কিছু অর্থনীতিবিদের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-এর কারণে সরাসরি কর্মী ছাঁটাই না হলেও, যেসব পেশায় এআই-এর প্রভাব বেশি, সেখানে বেতন হ্রাস পেয়েছে এবং কর্মীদের পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা কমেছে। এর মূল কারণ হতে পারে দক্ষতা ও মূল্যায়নের মধ্যবর্তী ব্যবধান। যারা সচেতনভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেন তারা এগিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু যারা কেবল শর্টকাট খুঁজছেন, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের মূল্য হারিয়ে ফেলছেন।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি আসার পর এমন ভীতি তৈরি হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০ অব্দে সক্রেটিস লিখে রাখার প্রযুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, লেখা মানুষের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেবে এবং মানুষকে কেবল জ্ঞানের ভণ্ড হিসেবে গড়ে তুলবে। পরবর্তীতে মুদ্রণ যন্ত্র এবং ক্যালকুলেটরের আগমনেও একই ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। আশির দশকে গণিত শিক্ষক জন স্যাক্সন সতর্ক করেছিলেন যে, মৌলিক গণিত শেখার আগেই ক্যালকুলেটরের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মানসিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা পরবর্তী গবেষণাতেও প্রমাণিত হয়।
গ্রিক দর্শনে আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব বা জেনেও ভুল পথে হাঁটার প্রবণতাকে বলা হয় 'আক্রাসিয়া' (akrasia)। অ্যারিস্টটল এই বিষয়টিকে একটি স্কেলের মতো ব্যাখ্যা করেছেন। একদিকে আছে 'সোফ্রোসিনে' বা পরিমিতিবোধ, যেখানে মানুষ সহজাতভাবেই সঠিক পথ বেছে নেয়। অন্যদিকে আছে 'একোলাসিয়া', যেখানে শর্টকাট নেওয়ার অভ্যাস এতটাই গভীর হয় যে মানুষ আর সেটিকে প্রলোভন হিসেবে গণ্য করে না। বর্তমান যুগে এআই-কে যারা কেবল টিউটর হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে, তারা পরিমিতিবোধের চর্চা করছে; আর যারা কেবল কাজ ফাঁকি দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করছে, তারা অজান্তেই একোলাসিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পরিশেষে, এআই-কে কেবল একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করে গভীরতর চিন্তার দিকে যাওয়া সম্ভব। তবে এর মূল চ্যালেঞ্জটি হলো মানুষের ভেতরের সেই আদিম ভয়—নিজেকে অযোগ্য মনে করা এবং প্রলোভনের কাছে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটিই নির্ধারণ করবে প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ কি আরও সমৃদ্ধ হবে, নাকি তার নিজস্ব চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলবে।




