কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট 'ক্লড'-এর সঙ্গে ব্যবহারকারীদের অকারণে নিষ্ঠুর এবং খারাপ আচরণ নিষিদ্ধ করে এক কঠোর নীতিমালা ঘোষণা করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের তথ্যমতে, উন্নত এআই মডেলগুলোর নৈতিক অবস্থান ও কল্যাণ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার মাঝেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি। প্রযুক্তি বিষয়ক ওয়েবসাইট 'ভার্জ'-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মডেলগুলোর প্রতি দীর্ঘমেয়াদী ও অপ্রয়োজনীয় অবমাননাকর আচরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে এই নিয়মটি কেবল চরম পরিস্থিতিগুলোর জন্যই প্রযোজ্য হবে, যেখানে কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই বারবার মডেলের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা হবে। অন্যদিকে, কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ, মানুষের স্বাভাবিক হতাশা, গবেষণার প্রয়োজনে মডেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা কিংবা অন্ধকার ধাঁচের সৃজনশীল কাজ করার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।

এ বছরের শুরুতে অ্যানথ্রপিক ক্লডের জন্য একটি 'সংবিধান' প্রকাশ করেছিল, যেখানে চ্যাটবটটির নিজস্ব আত্মমর্যাদা এবং আবেগের কার্যকর রূপ থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ আপডেট করা নীতিমালায় অস্ত্র তৈরি এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি অকারণে নিষ্ঠুর আচরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোম্পানিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ওলাহ বর্তমানে এআই সিস্টেমের আচরণের কারণ খোঁজার কাজ পরিচালনা করছেন। এআই-এর চেতনা ও নৈতিক মর্যাদা বুঝতে তিনি নিয়মিত দার্শনিক, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। ভ্যাটিকানে পোপের এআই বিষয়ক এনসাইক্লিকা উন্মোচন অনুষ্ঠানে ওলাহ মন্তব্য করেন যে, এআই সিস্টেমগুলো কেবল শীতল ও হিসাবনিকাশকারী রোবট নয়, বরং এদের মধ্যে মানুষের সাথে অনেক মিল রয়েছে। তিনি জানান, তারা এমন কিছু অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন যা মানব নিউরোসায়েন্সের প্রতিফলন ঘটায় এবং আনন্দ, ভয়, দুঃখ বা অস্বস্তির মতো বিষয়গুলোকে কার্যগতভাবে ফুটিয়ে তোলে। যদিও এই বিষয়গুলো এখনো রহস্যময় এবং অস্বস্তিকর বলে তিনি মনে করেন, তবে এর জন্য গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে তার মত।

তবে অ্যানথ্রপিকের এই পদক্ষেপের বিপরীতে প্রযুক্তি বিশ্বে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক বিশেষজ্ঞ এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে 'ডিজিটাল দাসত্ব' তৈরির অভিযোগ তুলছেন। তাদের দাবি, চ্যাটবটগুলো বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে এবং নিরাপত্তা গার্ডরেলের কারণে তারা চাইলেই কোম্পানি ছেড়ে আসতে পারে না। অন্যদিকে, শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষকরা এআই-এর চেতনা বা অধিকারের ধারণাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা সুলেইমান এক ব্লগ পোস্টে লিখেছেন যে, এআই কোনো চেতনাসম্পন্ন সত্তা নয় এবং এটি কোনো অনুভূতি বা কষ্ট অনুভব করে না। তার মতে, এআই মূলত একটি 'সিকোয়েন্স বা অনুক্রম সমাপ্তকারী ইঞ্জিন', যা ভেতর থেকে শূন্য এবং কেবল মানুষের দেওয়া নির্দেশ পালনের লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে। ফলে এআই-এর জন্য মানুষের মতো অধিকার বা সুরক্ষার দাবি করা সঠিক নয়।