কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে প্রায়শই শিল্প বিপ্লবের সাথে তুলনা করা হয়। তবে এই তুলনাকে কেবল রূপক হিসেবে না দেখে বাস্তব প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন নোটবল ক্যাপিটালের ম্যানেজিং পার্টনার এবং এয়ারবিএনবি ও কয়েনবেসের মতো প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকের বিনিয়োগকারী হ্যানস তুং। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপ বা কোম্পানির সাফল্যের চেয়ে বড় বিষয় হলো সেই প্রযুক্তির পেছনে থাকা সামগ্রিক অবকাঠামো।
উনিশ শতকের নৌ-শক্তির উদাহরণ দিয়ে তুং জানান, পর্তুগিজ বা স্প্যানিশরা বড় কাঠের জাহাজ ব্যবহার করলেও ব্রিটিশরা প্রথম স্টিম ইঞ্জিন এবং ইস্পাতের প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছিল। এই অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কারণেই ব্রিটিশ নৌবাহিনী বিশ্বের বাকি সব শক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে বিশ্ব শাসন করে। তুংয়ের মতে, বর্তমান এআই বিপ্লবেও একই ধারা দৃশ্যমান। কেবল উন্নত মডেল তৈরি করলেই হবে না, সেই মডেলটি কার্যকরভাবে চালানোর জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটিং পাওয়ার বা পরিকাঠামো থাকতে হবে।
একুশ শতকের 'রেলওয়ে' হিসেবে তিনি ডেটা সেন্টারকে চিহ্নিত করেছেন। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, উত্তর দিকটি জয়ী হয়েছিল মূলত তাদের উন্নত রেলওয়ে নেটওয়ার্কের কারণে, যা সৈন্য ও রসদ দ্রুত স্থানান্তরের সুযোগ করে দিয়েছিল। একইভাবে, বর্তমানে কারিগরি দক্ষতা বা মেধাবী চিন্তাবিদ থাকা সত্ত্বেও যদি পর্যাপ্ত কম্পিউট ক্ষমতা না থাকে, তবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। অর্থাৎ, যার কাছে সবচেয়ে সহজলভ্য এবং শক্তিশালী কম্পিউটিং পরিকাঠামো থাকবে, সেই জয়ী হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে তুং জানান, অবকাঠামো নির্মাণে চীন গত দুই দশকে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক এখন বিশ্বের বাকি সব দেশের সম্মিলিত নেটওয়ার্কের চেয়েও বড়। এমনকি বর্তমান জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও চীনের আধিপত্য ব্যাপক; বিশ্বজুড়ে নতুন জাহাজের অর্ডারের ৮০ শতাংশের বেশি তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা যে পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি করে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৮১ বছরে আমেরিকার পুরো জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মোট উৎপাদনের চেয়েও বেশি।
তবে ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। রক্ষণশীল হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পিউট ক্ষমতা অন্তত ৪৭ গিগাওয়াট, যেখানে চীনের ক্ষমতা প্রায় ২৪ গিগাওয়াট। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এক ঐতিহাসিক নির্মাণ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের এক অধ্যাপকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩২ সাল পর্যন্ত এআই পরিকাঠামো নির্মাণ মার্কিন জিডিপির গড় ৩.৬ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। যদিও এই দ্রুত প্রসারের পথে বিদ্যুৎ গ্রিডের সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
পরিশেষে হ্যানস তুং সতর্ক করে বলেন, কেবল সেরা ধারণা বা মেধাবী মানুষ থাকলেই জয় নিশ্চিত হয় না। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই যুগে উদ্ভাবনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই উদ্ভাবনকে বড় পরিসরে কার্যকর করার অবকাঠামো তৈরি করা। এআই যুদ্ধে কেবল জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা করলেই চলবে না, বরং তা নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম ও পরিকল্পিত পরিকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য।




