দুই দম্পতির একটি ডিনার পার্টি নিয়ে সিনেমা তৈরি হলে দর্শক হিসেবে আমাদের মনে যে প্রত্যাশা জন্মায়, সেটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয় না। হালকা, মজার ও ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তা দিয়ে শুরু হয়ে সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতার মুখোশ খুলে গিয়ে যে নির্মম সত্য ফুটে ওঠে—এই ধাঁচটিই যেন দর্শক হিসেবে আমাদের মনে গেঁথে আছে। অলিভিয়া ওয়াইল্ডের পরিচালনায় ‘দ্য ইনভাইট’ ঠিক সেসব প্রত্যাশাই পূরণ করেছে।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন সান ফ্রান্সিসকোর সাধারণ এক দম্পতি—জো (সেথ রোহান) ও অ্যাঞ্জেলা (অলিভিয়া ওয়াইল্ড)। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তারা পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি পিনা (পেনেলোপে ক্রুজ) ও হককে (এডওয়ার্ড নর্টন) রাতের খাবারে আমন্ত্রণ জানান। প্রথমে বেশ ভদ্র পরিবেশে শুরু হয় আড্ডা; জীবন, পেশা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন চারজন। কিন্তু আস্তে আস্তে আলোচনা দাম্পত্য ও যৌনজীবনের দিকে মোড় নেয়। একপর্যায়ে পিনা ও হকের কাছ থেকে আসে উদ্ভট এক ‘আমন্ত্রণ’, যেখানে গিয়ে ছবিটি প্রথমার্ধের ধীর গতি ভুলে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর টোন—বাইরে থেকে দেখলে দারুণ মজার, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত সিরিয়াস। নির্মাণে উডি অ্যালেনের প্রভাব স্পষ্ট, বিশেষ করে জো চরিত্রটিতে। একসময় ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন জো, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় এখন কলেজে সংগীত শেখান। জীবনের প্রতি তার একধরনের হতাশা কাজ করে; দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, পিঠের ব্যথা আর পেশাগত ব্যর্থতা তাকে খিটখিটে করে তুলেছে। অন্যদিকে অ্যাঞ্জেলা, যিনি আর্ট স্কুলে পড়লেও সেই শিক্ষা আর কাজে লাগাননি, সংসার স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। স্নায়ুচাপে থাকা এক নারী অ্যাঞ্জেলা, আর জো যেন উডি অ্যালেন ও ল্যারি ডেভিডের সেই রসিক ও বিরক্তিকর মানুষ, যে সবকিছুতেই খুঁত ধরে।
রোমান পোলানস্কির ‘কারনেজ’ ছবির সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। ইয়াসমিনা রেজার মঞ্চনাটক অবলম্বনে নির্মিত সেই ছবিতেও চারজন মানুষের মধ্যকার অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দেখানো হয়েছিল। ‘দ্য ইনভাইট’-এর আরেকটি আকর্ষণ হলো সংলাপের প্রবাহ; চরিত্ররা প্রায়ই একে অন্যের কথার ওপর কথা বলেন, যেমনটি বাস্তব জীবনে ঘটে, আর সাথে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত পাল্টা জবাব। ফলে ঘরোয়া রাগ ও বিরক্তিও দর্শকের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
চার অভিনয়শিল্পীর পারফরম্যান্স অসাধারণ। নিজের পরিচিত খসখসে, যুক্তিবাদী চরিত্রের ওপর দাঁড়িয়েই সেথ রোহান জো চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন। অলিভিয়া ওয়াইল্ড অ্যাঞ্জেলার আকাঙ্ক্ষা, অসুখী জীবন আর এখনো আঁকড়ে থাকা স্বপ্নের অস্থিরতা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এডওয়ার্ড নর্টনের হক দর্শককে হাসালেও তার নিজের জীবনের গল্প যখন সামনে আসে, তখন একটি মনোলগের সময় সবাই চুপ হয়ে যেতে বাধ্য। আর পেনেলোপে ক্রুজের পিনা পুরো ঘটনার অনুঘটক।
তবে ‘দ্য ইনভাইট’ নিখুঁত নয়; প্রথমার্ধটি বেশ বিরক্তিকর। দর্শককে মুগ্ধ করার চেষ্টায় ছবিটি শুরুতে কিছুটা বাড়াবাড়ি করে। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সহজ ও স্বচ্ছন্দ ছন্দে পৌঁছে যায়, তখন মনে হয় না কেউ গল্প শোনাচ্ছে, বরং কয়েকজন মানুষের জীবনযাপন দেখছি। দুই দম্পতির যন্ত্রণাদায়ক ডিনার পার্টির মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত বিবাহিত জীবনের নানা অসংগতি ও ভণ্ডামি ফুটিয়ে তুলেছে ছবিটি। অল্প বাজেটে, মাত্র চারজন শিল্পীকে নিয়ে চার দেওয়ালে বন্দী গল্পকে যেভাবে উপভোগ্য করে তুলেছেন, তার জন্য পরিচালক হিসেবে অলিভিয়া ওয়াইল্ড প্রশংসার দাবিদার।
সিনেমা: ‘দ্য ইনভাইট’; ধরন: ড্রামা; পরিচালনা: অলিভিয়া ওয়াইল্ড; অভিনয়: সেথ রোহান, অলিভিয়া ওয়াইল্ড, এডওয়ার্ড নর্টন ও পেনেলোপে ক্রুজ; দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট; স্ট্রিমিং: এইচবিও ম্যাক্স।




