আকাশপথের নিরাপত্তা, প্রকৌশল দক্ষতা ও মার্কিন শিল্পসাফল্যের প্রতীক হিসেবে একসময় বোয়িংয়ের নাম ছিল আস্থার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভাবমূর্তিতে চিড় ধরেছে। লায়ন এয়ার ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ভয়াবহ দুর্ঘটনা, হুইসেলব্লোয়ার জন বার্নেটের রহস্যজনক মৃত্যু—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা সংস্কৃতির অন্ধকার দিক নতুন করে সামনে এনেছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র 'ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং'। অস্কার মনোনীত নির্মাতা ররি কেনেডির পরিচালনায় ৯৩ মিনিটের এই ছবিটি ১৯ আগস্ট মুক্তি পেয়েছে।

তথ্যচিত্রটির সূচনা ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাভা সাগরে লায়ন এয়ারের ফ্লাইট ৬১০ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা দিয়ে। মাত্র পাঁচ মাস পর ২০১৯ সালের মার্চে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩০২-ও বিধ্বস্ত হয়। দুটি বিমানই ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের। এই দুই দুর্ঘটনায় মোট ৩৪৬ জন প্রাণ হারান। এরপর বিশ্বজুড়ে ৭৩৭ ম্যাক্সের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং বহরটি সাময়িকভাবে গ্রাউন্ডেড করা হয়। নতুন মডেল বাজারে দ্রুত আনার প্রতিযোগিতা ও খরচ কমানোর চাপে নিরাপত্তা উপেক্ষিত হয়েছে—এমন অভিযোগই অনুসন্ধান করেছিল কেনেডির আগের তথ্যচিত্র 'ডাউনফল: দ্য কেস এগেইনস্ট বোয়িং' (২০২২)। কিন্তু প্রথম ছবির পরও গল্প যে শেষ হয়নি, তা বোঝেন নির্মাতা। ৭৩৭ ম্যাক্স আকাশে ফেরার পরও বোয়িং নিয়ে নেতিবাচক খবর আসতে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে হুইসেলব্লোয়াররা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তাঁদের দাবি, পরিস্থিতির উন্নতির বদলে কিছু ক্ষেত্রে আরও অবনতি ঘটেছে।

'ফ্রিফল' কেনেডির কাছে নিছক সিক্যুয়েল নয়; এটি একটি অসমাপ্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস। প্রথম ছবি শেষে তাঁর ধারণা ছিল, বোয়িং হয়তো ভুল বুঝে পরিবর্তনের পথে হাঁটবে, কিন্তু বাস্তবতা সেই বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জন বার্নেটের মৃত্যু। সাবেক কোয়ালিটি কন্ট্রোল কর্মকর্তা বার্নেট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন এবং 'ডাউনফল'-এ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি কেনেডির বন্ধু হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালের মার্চে বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলায় জবানবন্দি দেওয়ার সময় দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় তাঁর মরদেহ গাড়ির ভেতর পাওয়া যায়। করোনারের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তবে ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। বার্নেটের মৃত্যুই নতুন ছবি বানানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন কেনেডি।

ছবির আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বার্নেট। চার্লসটনের কারখানায় কাজ করার সময় তিনি উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের নানা সমস্যা সামনে আনেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, যন্ত্রাংশ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলো বিমানের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার পর সমাধানের বদলে তাঁকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় এবং বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয়। নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি প্রতিষ্ঠানের আরও ত্রুটি দেখতে পান। অবসরের পর মানহানির মামলাও করেছিলেন তিনি। আইনি লড়াইয়ের মাঝপথে তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—একটি প্রতিষ্ঠান তার সমালোচকদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে? তবে তথ্যচিত্রে বার্নেটের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে সরকারি তদন্তে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অনলাইনে ছড়ানো ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

তথ্যচিত্রে হুইসেলব্লোয়ারদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, আধুনিক যুগে বোয়িংয়ের সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে—মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব কমেছে, কর্মীদের ওপর চাপ বেড়েছে এবং দ্রুত উৎপাদন ও খরচ কমানোর বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে ২০০৯ সালে চার্লসটনে চালু হওয়া ৭৮৭ ড্রিমলাইনার প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে যন্ত্রাংশ এনে সংযোজনের সময় পাইপ ঠিকমতো না মেলা, কাঠামোয় ত্রুটি এমনকি ছোট ধাতব কণার উপস্থিতির মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আরও অস্বস্তিকর বিষয় হলো, যাঁরা এসব বিমান তৈরি করছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ নিজেরাই সেই বিমানে উঠতে অনিচ্ছুক ছিলেন। ২০১৩ সালে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বহর ব্যাটারিতে আগুন লাগার ঘটনায় গ্রাউন্ডেডও করা হয়েছিল।

বোয়িংয়ের সংকট শুধু পুরোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনসের ৭৩৭ ম্যাক্স ৯ বিমানের মাঝ আকাশে দরজার প্লাগ খুলে যায়, তখন বিমানে ছিলেন ১৭১ জন যাত্রী। বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করলেও ঘটনাটি আবারও উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনার পরও কেন একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ বারবার সামনে আসছে—সমস্যা যদি নকশায় সীমাবদ্ধ হতো, তাহলে সংশোধনের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব হতো, কিন্তু একের পর এক ঘটনায় ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন উঠলে তা হয়ে ওঠে করপোরেট সংস্কৃতির সমস্যা।

১৯৯৭ সালে ম্যাকডোনেল ডগলাসের সঙ্গে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একীভবনকে ছবিতে সংস্কৃতি বদলের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার পর ব্যবসায়িক দক্ষতা ও আর্থিক ফলাফল ক্রমশ বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে। তবে তথ্যচিত্রের এসব অভিযোগ মূলত হুইসেলব্লোয়ার, সাবেক কর্মী ও নির্মাতার অনুসন্ধানের ভিত্তিতে, এবং বোয়িং সব অভিযোগ স্বীকার করেনি। জবাবে বোয়িং জানিয়েছে, কিছু অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং কিছু বিষয়ে তারা ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে; নতুন নেতৃত্বের অধীনে সংস্কৃতি বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের গল্পও ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের দুর্ঘটনায় স্বামী মাইক রায়ানকে হারানো নওয়াইসে কনোলি রায়ান শুধু ক্ষতিপূরণের জন্য নয়, দায়বদ্ধতার দাবিতেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন—কোনো কোম্পানি নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য মানুষের জীবন হারানোর পরও যদি কেবল অর্থনৈতিক জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়?

'ফ্রিফল' শুধু একটি বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্যচিত্র নয়; এটি বড় করপোরেশন কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজের মূল মূল্যবোধ হারাতে পারে, তার অনুসন্ধান। একসময় যে প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, সেটিই যদি উৎপাদনের গতি, খরচ কমানো ও শেয়ারমূল্যের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ছবিটির নাম 'ফ্রিফল' শুধু আকাশ থেকে বিমানের পতন বোঝায় না; এটি বোয়িংয়ের সুনাম, নিরাপত্তার সংস্কৃতি এবং জনআস্থার পতনের প্রতীক। কেনেডির প্রশ্ন সরল—এত কিছুর পরও কি যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে? তাঁর মতে, উত্তর এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। তথ্যচিত্রের উদ্দেশ্য বোয়িংকে অতীতের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং ভবিষ্যতে বিমানশিল্পে নিরাপত্তা কীভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরে রাখা যায়, সেই আলোচনাকে সামনে আনা। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার দায় এক-দুইজনের নয়; ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সংস্কৃতি, উৎপাদনব্যবস্থা, খরচ কমানোর নীতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং হুইসেলব্লোয়ারদের সঙ্গে আচরণ—সবকিছু মিলেই নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি হয়। বিমানশিল্পে ভুলের মূল্য অনেক বেশি, কারণ একটি নিরাপত্তা ব্যর্থতা এক মুহূর্তে শত শত মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। তাই ছবিটি বোয়িংয়ের অতীত নিয়ে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা—ব্যবসায়িক সাফল্যের দৌড়ে নিরাপত্তাকে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দিলে সেই পতন কোথায় গিয়ে থামবে, তারই অনুসন্ধান।