গত সপ্তাহে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় স্ত্রী লুসি মুটেকের সাথে প্রাণ হারালেন জিম্বাবুইয়ের প্রভাবশালী টাইকুন উইকনেল চিভায়ো। ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি তার জীবনভর এমন এক জীবনধারা গড়েছিলেন, যা তাকে একইসাথে অনেকের কাছে প্রিয় এবং অনেকের কাছে ঘৃণিত করে তুলেছিল। নিজেকে 'স্যার উইকনেল' বলে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিলাসবহুল জীবন প্রদর্শনে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। দামী রোলস-রয়স গাড়ি, দামী ঘড়ি এবং ডিজাইনার জুতার বিশাল সংগ্রহের ভিডিও ট্যুর করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন মানুষকে নগদ টাকা ও দামী গাড়ি উপহার দেওয়ার দৃশ্য নিয়মিত প্রচার করতেন।
চিভায়োর অনুসারীরা তাকে একজন দয়ালু মানুষ হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, তার এই প্রদর্শন ছিল চরম বৈষম্যের প্রতীক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জিম্বাবুইয়ের প্রায় অর্ধেক মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, আর সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই তিনি তার সম্পদের অপচয় ও প্রদর্শনী চালিয়ে যেতেন। জিম্বাবুই ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক পেডজিসাই রুহানিয়া মনে করেন, চিভায়োর দান ছিল মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও শাসক দল জানু-পিএফ (Zanu-PF)-এর সমর্থন আদায়ের একটি কৌশল মাত্র।
চিভায়োর জীবন শুরু হয়েছিল অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে। ১০ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক সংকটে ১৫ বছর বয়সেই হাইস্কুল ছাড়তে হয় তাকে। প্রথম চাকরি করেন এক বাস কোম্পানিতে বেতন ক্লার্ক হিসেবে। পরবর্তীতে মোবাইল ফোন বিক্রি এবং কালোবাজারে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায় নামেন। তবে তার এই পথ খুব সহজ ছিল না; ২০০৫ সালে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তিনি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান, যার মধ্যে তিন বছর জেল খাটেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি জ্বালানি খাতের ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং সরকারি কন্ট্রাক্ট বা টেন্ডার পাওয়ার মাধ্যমে দ্রুত সম্পদ আহরণ করেন, যাকে অনেকে 'টেন্ডারপ্রেনিউর' বলে অভিহিত করেছেন।
তার ব্যবসায়িক জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল ১৪ সালে ইন্ট্রাট্রেক জিম্বাবুই-এর মাধ্যমে একটি ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি। ১৭ কোটি ডলারের এই চুক্তিতে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েও আদালতের মাধ্যমে চুক্তিটি বজায় রাখতে সক্ষম হন তিনি। সংসদীয় তদন্তে তার কোম্পানিটিকে একটি 'ব্রিফকেস কোম্পানি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। অথচ মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সরকার তাকে এই প্রকল্প শেষ করার জন্য আরও ২৪ মাস সময় দেয়।
রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে চিভায়ো ছিলেন অনন্য। শুরুতে রাষ্ট্রপতি এম্মারসন মাননগাওয়া তাকে পছন্দ না করলেও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুধু জানু-পিএফ নয়, বিরোধী দলের নেতাদের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল। তবে তিনি মাননগাওয়ার প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করতে কখনও দ্বিধা করেননি। এমনকি ২০৩৩ সালের নির্বাচনের সামগ্রী সংগ্রহে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রমাণিত হয়নি। একবার তিনি দেশের ৩৬০ জন আইনপ্রণেতাকে ১০ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হিসেবে দেখা হয় এবং তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন।
আফ্রিকীয় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ইসোয়াতিনি-র রাজা তৃতীয় মসওয়াটি তাকে নাগরিকত্ব এবং কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রদান করেন। এছাড়া নাইজেরিয়া, তাঞ্জানিয়া, মালাউই, মোজাম্বিক এবং জাম্বিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে তার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোর সাথেও তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল, যা নিয়ে কেনিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হয়।
চিভায়োর দানশীলতার তালিকা ছিল দীর্ঘ। তিনি গায়ক জাহ প্রেজাহ, বিশপ নেহেমিয়া মুতেন্দি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রচুর অর্থ ও দামী গাড়ি দান করেছিলেন। তবে থমাস মাপফুমোর মতো সমালোচক তার এই অর্থকে 'নোংরা টাকা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যদিও শেষ জীবনে তিনি ২০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং স্কুল-ক্লিনিকের জন্য বড় অংকের অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন। মৃত্যুর দিন তিনি তার গ্রামের বাড়িতে ১০ লাখ ডলারের একটি অট্টালিকা নির্মাণ করছিলেন এবং স্থানীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার এই আকস্মিক প্রয়াণে শাসক দল জানু-পিএফ তাদের একজন রঙিন প্রচারককে হারাল, কিন্তু তার অতি সামান্য শুরু থেকে কোটিপতি হয়ে ওঠার রহস্যটি রয়ে গেল অমীমাংসিত।




