বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে এখন এক বিশাল 'পাইকারি বাজারে' পরিণত হয়েছে ভারত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দার আড়ালে থেকে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে কাজ করছে ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে ভারতের আহমেদাবাদের মতো শহরের সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে ডিজিটাল কন্টেন্ট নির্মাতারা হাজার মাইল দূরের কেনিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের জন্য প্রচারসামগ্রী তৈরি করছেন।

২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর জয়ের নেপথ্যে ছিল এই ধরনের গোপন কারসাজি। রাজন কুমার নামের এক ভারতীয় তরুণ প্রতিদিন মাত্র ৭ ডলার মজুরিতে রুটোর পক্ষে বিতর্কিত পোস্ট ও ভিডিও তৈরি করতেন। তবে এই কন্টেন্টগুলো রুটোর অফিসিয়াল পেজ থেকে নয়, বরং পরিচয় গোপন রাখা বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হতো, যাতে মনে হয় এগুলো সাধারণ মানুষের স্বতন্ত্র মতামত। বিরোধী নেতাদের সুনাম নষ্ট করতে বিশেষ করে নারী রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বক্তৃতার অংশ কেটে বিকৃত করার মতো অসাধু কৌশল তারা ব্যবহার করতেন।

এই তৎপরতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে ভারতীয় বট এবং বেনামি অ্যাকাউন্ট ব্যবহৃত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং 'অ্যান্টিবট ফর নাভালনি'র মতো গবেষক গোষ্ঠীর তথ্যানুসারে, এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত ২৮টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে অন্তত ১৫টি ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। এই অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও ৭০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন।

নৈদিল্লির রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরির মতে, বর্তমান যুগে ভোটারের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই; সবকিছুই কারসাজির বিষয়। তিনি জানান, মেটা এবং গুগলের কঠোর নিয়মাবলির মাঝেও অনেক ফাঁক থাকে, যা ভিপিএন (VPN) বা অ্যাকাউন্টের উৎস-দেশ পরিবর্তন করে সহজেই কাজে লাগানো যায়। এছাড়া, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান চালিকাশক্তি হলো 'কালো টাকা'। হোয়ালা নেটওয়ার্ক বা বিদেশে থাকা ছদ্ম কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে তারা অবৈধভাবে অর্থ লেনদেন করে। পুরান দিল্লির চাঁদনি চক বাজারের কিছু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে এই লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক অমোঘ ধর শর্মার মতে, এটি বৈশ্বিক আউটসোর্সিং শিল্পের এক অন্ধকার রূপ। ২০০০-এর দশকে ভারত যেভাবে আইটি সেবায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, এখন সেভাবেই রাজনৈতিক কারসাজির কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এই কারসাজি ফাঁস হলেও মূল প্রচারশিবির সহজেই দায় অস্বীকার করতে পারে। তবে এই পেশার ঝুঁকিও প্রবল। কেনিয়ায় রুটোর পক্ষে কাজ করা দুই ভারতীয় পরামর্শক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, যা এই বিপজ্জনক ব্যবসার এক চরম উদাহরণ।