মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা গত চার দিনের টানা দরপতনের ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। এদিন সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেলেও পরবর্তীতে তা সামান্য হ্রাস পেয়ে ১০১ ডলার ৮০ সেন্টে নেমে আসে। একই সাথে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামেও প্রবৃদ্ধির আভাস পাওয়া গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার দিকে নজর রাখছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মতি জানিয়েছেন। তবে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় ফেরার বিষয়ে ইরান নির্দিষ্ট কিছু শর্তারোপ করেছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার মনে করেন, তেলের দাম কমার প্রত্যাশায় যারা বিক্রির পথে ছিলেন, তারা এখন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন, যার ফলে দামের এই ওঠানামা দেখা দিচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরামকোর রিয়াদ ও ইয়ানবু স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চীন তেহরানের সহযোগিতা চেয়েছে, কারণ সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করেছে। এছাড়া সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার কারণে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, রোববার সাতটি বড় ট্যাংকারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোড করা হয়েছে। সাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, গত ছয় মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে এবং দামের অস্থিরতা হ্রাস করেছে।
অন্যদিকে লিবিয়ায় জ্বালানি উৎপাদন সংকটে পড়েছে। দেশটির ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন জানিয়েছে, একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী শরারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরমুখী পাইপলাইনের ৭ নম্বর ভাল্ভ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই দরের প্রভাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় অপরিশোধিত তেলের দামের একটি হিসাব পাওয়া যায়। এক ব্যারেল (১৫৯ লিটার) তেলের দাম ১০২ ডলার হলে এবং ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরলে, প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৭৯ টাকা। তবে এটি কেবল আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য। এর সাথে পরিবহন, বিমা, পরিশোধন, সংরক্ষণ এবং সরকারি শুল্ক-কর যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বার্ষিক তেল পরিশোধনের সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন, যেখানে আমদানি করতে হয় প্রায় ৭০ লাখ টন। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করে, যা স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।




