চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৪৮টি দেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী। তবে এই সংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি গেছেন মাত্র দুটি দেশে—সৌদি আরব ও জর্ডানে। গৃহকর্মী ছাড়া অন্য কোনো খাতে নারীদের পাঠানোর নতুন সুযোগ তৈরি না হওয়ায় বিদেশে নারী কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরই থেকে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী কর্মী। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৬২ হাজার ৩১৭ জনে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ২১৪ জন, যা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।
ফিরে আসা নারী কর্মীদের মধ্যে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, একাধিক বাড়িতে কাজ করানো, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঠিকমতো বেতন ও খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব অভিযোগের কারণে নারীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে; অপরদিকে দক্ষতা বৃদ্ধি করে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার গড়ে তোলাও যাচ্ছে না। ভাষা না জানা, রান্না বা ঘরকন্নার প্রশিক্ষণের অভাব এবং নিয়োগকর্তাদের (কফিল) একাধিক বাড়িতে কাজ করানোর প্রবণতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
গত ২০ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন মানিকগঞ্জের অঞ্জনা। মাত্র ১ মাস ৩ দিন সেখানে ছিলেন তিনি, তার মধ্যে কাজ করেছেন মাত্র ৫ দিন। বাকি সময় তাকে দেশটির রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরে নিজ খরচে টিকিট কেটে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে লেবানন, জর্ডান, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করেছেন অঞ্জনা। তার ভাষ্য, আগের কোনো অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনা ঘটেনি। সৌদিতে একজন নারী কর্মী পাঠানো হলে রিক্রুটিং এজেন্সি অর্থ পায়, তাই কোনোভাবে পাঠাতে পারলেই তাদের লাভ—কাজ ছাড়াই পাঠিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অনুরূপ অভিজ্ঞতা রয়েছে নরসিংদীর সানজীদা আখতারের। এক বছর আগে সৌদি থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। ২ মাস ২৫ দিন সেখানে থাকাকালে যে বাসায় কাজ করতেন, নিয়োগকর্তা তাকে নিজ বাড়ির পাশাপাশি মায়ের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতেও কাজ করাতেন। তিনি জানান, শুধু রুটি খেতে দেওয়া হতো, ভাত দেওয়া হতো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয়, এরপর শুরু হয় নানা নিপীড়ন। টিকতে না পেরে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন তিনি। এখন আর কোনো দিন বিদেশে যেতে চান না বলে জানান।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নারীর ভীতি কমাতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা চালু করা হয়েছে, সৌদিতে রয়েছে সেফ হোম। এতে নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি জাপান, হংকংয়ের মতো দক্ষ কর্মীর শ্রমবাজারে নজর দিয়েছে সরকার। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিং প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
ফিরে আসা কর্মীদের সেবা দিচ্ছে ব্র্যাক, রামরু, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ), নারী শ্রমিক কেন্দ্রের মতো সংস্থা। তাদের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকে নানা অসুস্থতা নিয়ে আসেন। মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে নিয়ে যাওয়া, ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো, কম বেতন, অনিয়মিত বেতন এবং নিয়মিত খাবার না দেওয়ার অভিযোগ আছে। অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
ওকাপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার; ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। ব্র্যাকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছে—প্রয়োজনে তারা শ্রমিক পাঠানোও বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি।
ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, নিপীড়নের শিকার হয়ে নারী কর্মীরা দেশে ফিরছেন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও বিচার পান না। অন্যান্য নারীরা এই সচেতনতার কারণে বিদেশে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ভালো বাজারও তৈরি হয়নি, কাজের বৈচিত্র্য আনা যায়নি। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের বিদেশে না পাঠানোই ভালো বলে মত দেন বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম।




