বিশ্বের অনেক বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যে সম্পর্কে তারা এখনো পুরোপুরি সচেতন নয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো, যা শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মূলত মানুষ সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে বা নিজেকে উন্নত হিসেবে উপস্থাপন করতে অনেক সময় সত্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, আর এই 'সাদা মিথ্যা' বা ভুল তথ্যই ব্যবসায়িক ডেটাবেসকে বিষাক্ত করে তুলছে।

লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি তরুণ প্রজন্মের সংস্কৃতি ও মানসিকতা নিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডকে পরামর্শ দিয়েছেন। ভাইস (VICE)-এ কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, অনেক সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ তরুণদের রুচি, আচরণ এবং আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। তাদের কাছে থাকা ডেটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং কার্যকর নয়। প্রথাগত পোলিং কোম্পানিগুলো সরাসরি এবং সাধারণ প্রশ্ন করে সাধারণ উত্তর পায়, যা বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মেলে না। এর ফলে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ ভুল জায়গায় চলে যায়। গত বছর এসোমার (Esomar)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইনসাইটস ইন্ডাস্ট্রির মূল্য প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাজার গবেষণাতেই ব্যয় হয়েছে ৫৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে সঠিক ও কার্যকর তথ্য কতটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে লেখক তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড মালমরাসের কথা উল্লেখ করেন। আলফ্রেড 'এনিওয়ান' (Anyone) নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেছিলেন, যেখানে বিশ্বের যে কারও কাছ থেকে পাঁচ মিনিটের পরামর্শ নেওয়া যেত। বাজারে ছাড়ার আগে করা জরিপে দেখা গিয়েছিল, সবাই এই সেবাটি পছন্দ করবে। কিন্তু বাস্তবে অ্যাপটি যখন চালু হলো, তখন ডাউনলোড সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৫ হাজারে পৌঁছালেও সক্রিয় ব্যবহারকারী কমে দাঁড়াল মাত্র ১ হাজারে। যারা জরিপে বলেছিলেন তারা এই সেবাটি নেবেন, বাস্তবে তারা কেউ অ্যাপটি ডাউনলোড করেননি। এখান থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ভুল প্রশ্ন করলে ভুল উত্তর পাওয়া যায়।

মানুষ কেন মিথ্যা বলে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের উদাহরণ দেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় অধিকাংশ মানুষই একমত হয়ে বলে যে এটি একটি বড় সমস্যা, কারণ সেটিই সামাজিকভাবে প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ হয়তো তাঁর মর্টগেজ বা অফিসের ম্যানেজারের সাথে মিটিং নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন। ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে; দামি ঘড়ি কেন তারা কিনছে জিজ্ঞেস করলে মানুষ 'কারুকার্য' বা 'গুণমান'-এর কথা বলে, কিন্তু অন্যদের কেন কেনে জিজ্ঞেস করলে তারা 'সামাজিক মর্যাদা'র কথা বলে। মানুষ নিজেকে অন্যের সামনে যেভাবে দেখাতে চায়, ডেটাতে সেটাই প্রতিফলিত হয়, প্রকৃত সত্য নয়।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য লেখক দুটি কার্যকর উপায়ের কথা বলেছেন। প্রথমত, মানুষকে সরাসরি প্রশ্ন না করে তাদের বন্ধু বা পরিচিতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন নিজের বদলে সামাজিক সার্কেলের হয়ে কথা বলে, তখন তথ্যগুলো অনেক বেশি বাস্তব ও সঠিক হয়। দ্বিতীয়ত, কেবল বর্তমান মুহূর্তের চিন্তাভাবনা না জানতে চেয়ে মানুষের পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশার কথা জিজ্ঞেস করা। পাঁচ বছর আগে তারা কী ভাবত, এখন কী ভাবছে এবং আগামী তিন বছরে কী ভাববে—এই ধারাবাহিকতা জানলে মানুষের বিশ্বাস ও আচরণের প্রকৃত দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব।

বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থান এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক কোম্পানি এখন 'সিন্থেটিক অডিয়েন্স' বা এআই-জেনারেটেড সিমুলেশন ব্যবহার করে তাদের আইডিয়া পরীক্ষা করছে। কিন্তু এই এআই মডেলগুলো যদি ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ গ্রাহক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তবে তার ফলাফল হবে বিপর্যয়কর। ভুল পদ্ধতিতে ভুল তথ্য দিয়ে এআই চালনা করলে ভুল সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত আসবে। লেখক সতর্ক করে বলেছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকের কাল্পনিক সংস্করণ নিয়ে কাজ করবে, তারা শেষ পর্যন্ত বাস্তব গ্রাহককে সঠিকভাবে বুঝতে পারা প্রতিষ্ঠানের কাছে পরাজিত হবে।