২ অক্টোবর জন্মদিনে রাজধানীর পূর্বাচল ক্লাবে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে এক খোশগল্পে অংশ নেন প্রখ্যাত ব্যান্ড সংগীতশিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস। সেখানে জীবনের প্রাপ্তি, সংগীতের বর্তমান ধারা এবং ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন তিনি। জেমস জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে জন্মদিন খুব একটা ঘটা করে পালন করেন না, তবে ভক্তদের ভালোবাসা ও আয়োজন দেখে তিনি আনন্দিত হন। নব্বইয়ের দশকের জেমস এবং বর্তমানের জেমসের মধ্যে চিন্তাভাবনায় কোনো পার্থক্য নেই বলে তিনি দাবি করেন, তবে ঠাট্টার ছলে জানান যে কেবল চুলের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির করুণ অবস্থার কথা বলতে গিয়ে জেমস ফটোগ্রাফির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, একসময় ফিল্মের যুগে ফটোগ্রাফির বিশেষ গুরুত্ব ছিল, কিন্তু ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতায় তা যেমন অতি-স uma saturated হয়ে গেছে, সংগীতের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। আগে মানুষ গান কিনত, কিন্তু এখন ইউটিউব বা স্পটিফাইতে বিনামূল্যে গান পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গানের আর্থিক মূল্য কমে গেছে এবং পেশাদারভাবে গান বানিয়ে বেঁচে থাকা বর্তমান মিউজিশিয়ানদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে যারা লাইভ পারফরম্যান্সে দক্ষ, তারা এখনও সুফল পাচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। এআই কোডিং থেকে শুরু করে আর্টের বিভিন্ন রূপ বদলে দিচ্ছে, তাই মিউজিশিয়ানদের উচিত এই আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো। সৃজনশীলতার জায়গায় এটি বাধা নয়, বরং সংগীত এখন অনেকের কাছেই একটি বিশুদ্ধ প্যাশন বা শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেমনটি মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জেমস জানান, নতুন গান করার ইচ্ছা তাঁর সবসময়ই থাকে। তবে দেশ-বিদেশের কনসার্ট এবং লাইভ শোর ব্যস্ততার কারণে স্টুডিওতে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রচলিত ছকে ১০-১২ গানের পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গান আসলে তিনি তা করবেন। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের গান কাভার করার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন এবং মনে করেন সংস্কৃতিকে নদীর মতো বয়ে চলতে দিতে হবে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রয়াত আইকন আইয়ুব বাচ্চুর কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন জেমস। তিনি বলেন, বাচ্চুর সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল অসাধারণ এবং তাদের মধ্যে ছিল এক সুস্থ প্রতিযোগিতা। সেই সময়ে শিল্পীরা একে অপরের রেকর্ডিংয়ে গিয়ে আড্ডা দিতেন, যা এখনকার হোম-স্টুডিও যুগে হারিয়ে গেছে। এছাড়া কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘তারায় তারায়’ গানটি তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের বলে জানান তিনি।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি নিয়ে জেমস বলেন, তিনি জীবনের হিসাব-নিকাশ করেন না। দুঃখকে মুছে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর জীবনদর্শন। তরুণ সংগীতশিল্পীদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা—অর্থ বা পাওয়ারের নেশায় গান না করে কেবল ভালোবাসা ও প্যাশন থেকে সংগীত চর্চা করতে হবে, অন্যথায় হতাশ হতে হবে। বর্তমানে তিনি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন স্টুডিওতে প্র্যাকটিস করেন।