যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন বারাক ওবামা। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি ৩৬৫টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জন ম্যাককেইনকে পরাজিত করেন এবং ২০০৯ সালের ২০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের ঠিক আগে, ২ নভেম্বর তিনি তার প্রিয় নানি ম্যাডেলিন ডানহ্যামকে হারান, যিনি তাকে বড় করেছিলেন।
ওবামার জন্ম ১৯৬১ সালে হাওয়াইয়ের হনলুলুতে। তার বাবা কেনিয়ার নাগরিক এবং মা শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিক। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে এবং তার শুরুর বছরগুলো কাটে ইন্দোনেশিয়ায়। পরবর্তীতে হাওয়াইয়ে ফিরে নানা-নানির কাছেই তিনি বড় হন। কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় ও শ্বেতাঙ্গ পরিবারের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার এই অভিজ্ঞতা তিনি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনীমূলক বই 'ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার'-এ ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি হার্ভার্ড ল রিভিউয়ের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তার পেশাগত তত্ত্বাবধায়ক মিশেল রবিনসনের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামার শাসনকাল ছিল নানা চ্যালেঞ্জ ও অর্জনের সংমিশ্রণ। তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেন যখন যুক্তরাষ্ট্র তীব্র আর্থিক মন্দা এবং ইরাক যুদ্ধের ফলে চরম হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তার নির্বাচনী স্লোগান 'চেঞ্জ উই ক্যান বিলিভ ইন' মার্কিন নাগরিকদের নতুন আশার আলো দেখায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ এবং গাড়িশিল্পে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করেন, যার ফলে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বেকারত্বের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এছাড়া ২০১০ সালে তিনি 'অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট' বা 'ওবামাকেয়ার' চালু করেন, যার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আসে। যদিও এই আইনের কিছু শর্ত নিয়ে পরে বিতর্ক তৈরি হয় এবং পলিটিফ্যাক্ট একে 'বছরের সেরা মিথ্যা' হিসেবে অভিহিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওবামার ভূমিকা ছিল বহুমুখী। ২০০৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার আমলের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নির্মূল করা। এছাড়া ইরান পরমাণু চুক্তি, কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার আমলের ড্রোন হামলাগুলো অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল। পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় তার অনুমোদনে ৫৪২টি ড্রোন হামলা চালানো হয়, যাতে প্রায় ৩২৪ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। এছাড়া লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপকে তিনি তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ওবামার সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ২০০৯ সালে তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম' প্রদান করেন। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর শ্রম অধিকার নিশ্চিত না করার অভিযোগে বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেন তিনি।
২০১৭ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ওবামা বই লেখা, চলচ্চিত্র প্রযোজনা এবং তার ফাউন্ডেশনের কাজে নিয়োজিত হন। স্ত্রী মিশেলের সঙ্গে তিনি 'হায়ার গ্রাউন্ড' নামক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সম্প্রতি জর্জিয়ায় এক জনসভায় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান নির্বাচনটি ব্যবস্থার এক 'সার্কিট ব্রেকার' হিসেবে কাজ করবে এবং কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলানোর মাধ্যমেই প্রশাসনের ভুলগুলো সংশোধন করা সম্ভব হবে।




