২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ ও শেষ আসর খেলছেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদরিচ। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে পরিচিত এই ফুটবলারের জীবন কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে।
মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি দেখেন তাঁর পিতামহকে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সার্বীয় সেনারা জাটন গ্রামে আক্রমণ চালালে মদরিচের পরিবার সবকিছু হারিয়ে শরণার্থী হয়ে পড়ে। জাদার শহরের একটি হোটেলের সরু কক্ষে কেটে যায় তাঁর শৈশবের সাত বছর। সেখানে বিদ্যুৎ ও খাবারের সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী, আর বোমা হামলার ভয় ছিল চিরস্থায়ী।
তা সত্ত্বেও ফুটবল ছিল তাঁর একমাত্র অবলম্বন। হোটেলের পার্কিং লটে, রাস্তার ধারে, এমনকি সেনা তাঁবুর পাশেও তিনি বল নিয়ে খেলতেন। শারীরিক দুর্বলতার কারণে বহু ক্লাব তাঁকে গ্রহণ করতে চায়নি। অনেকে বলতেন, 'এত রোগা ছেলে দিয়ে ফুটবল হবে না।' কিন্তু মদরিচ হাল ছাড়েননি।
স্থানীয় ক্লাব জাদারে খেলা শুরুর পর তাঁর প্রতিভা নজর কাড়ে দিনামো জাগ্রেবের। সেখানেও তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে নিজের গড়ন নিয়ে। এক সময় বসনিয়ার জ্রিনস্কি মোস্তারে খেলতে পাঠানো হয় তাঁকে। সেখান থেকেই তাঁর উত্থান শুরু। ২০০৮ সালে টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে পা রাখেন তিনি। চার বছর পর যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন দলের অপরিহার্য অংশ।
মাঠে মদরিচকে প্রায়ই ফুটবল অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টর হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তিনি নিজে গোল করতে তেমন পারদর্শী নন, বরং অন্যদের দিয়ে গোল করানোর অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন। তাঁর ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গি, চাপের মধ্যেও শান্ত মাথায় বল ধরে রাখা এবং নিখুঁত পাসিং তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। বল পায়ে আসার আগেই তিনি পরবর্তী তিনটি পদক্ষেপ ঠিক করে ফেলেন, যা 'প্রি-স্ক্যানিং' নামে পরিচিত।
২০১৮ সালে তিনি ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে এনে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। যদিও ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে রানার্সআপ হন, কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স তাঁকে ব্যালন ডি'অর এনে দেয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে এই পুরস্কার জেতেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে অসংখ্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ ট্রফি জিতেছেন মদরিচ।
ব্যক্তিত্বের দিক থেকে তিনি অত্যন্ত নম্র। মাঠে চিৎকার করা বা অহংকারী আচরণ তাঁর স্বভাব নয়। দলের প্রয়োজনে তিনি নিজেকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁর নেতৃত্বের মূলমন্ত্র হলো দায়িত্ব নেওয়া এবং অন্যদের উজ্জীবিত করা।
এবারের বিশ্বকাপ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন মদরিচ। শেষ ম্যাচে হেরে বিদায় নিলেও তাঁর মুখে ছিল প্রশান্ত হাসি। জীবনের শুরুটা যত কঠিনই হোক, শেষ পর্যন্ত কীভাবে একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন—সেটাই প্রমাণ করেছেন লুকা মদরিচ। তিনি আশা ও অধ্যবসায়ের প্রতীক। তাঁর গল্প বলে, যুদ্ধ শৈশব কেড়ে নিলেও স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।




