ফুটবল বিশ্বে গোলরক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম হলেও দলবদলের বাজারে তাদের মূল্যায়ন যেন সবসময়ই দ্বিতীয় সারির। ইংলিশ গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ডের সম্ভাব্য দলবদল এই বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে লিডস ইউনাইটেডে তার যোগ দেওয়া প্রায় নিশ্চিত, যেখানে দলবদল ফি ধরা হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। এই দলবদলটি সম্পন্ন হলে লিডস ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সেই ক্লাব হয়ে উঠবে যার সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হলেন একজন গোলরক্ষক।
আধুনিক ফুটবলে সাফল্যের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক কতটা জরুরি, তা বোঝানোর প্রয়োজন নেই। আর্সেনালের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ে দাভিদ রায়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তেমনি স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে উনাই সিমোনের অবদান অনস্বীকার্য। পিএসজির চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পেছনেও মাতভি সাফোনভের নির্ভরযোগ্যতা বড় কারণ ছিল। কিন্তু এই গুরুত্ব সত্ত্বেও গোলরক্ষকদের দলবদল ফি কখনোই প্রতিফলিত হয় না তাদের প্রকৃত মূল্যের।
দলবদল ফির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সর্বোচ্চ দামি গোলরক্ষকের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন কেপা আরিসাবালাগা। ২০১৮ সালে অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে চেলসি তাকে কিনেছিল ৮ কোটি ইউরোতে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আলিসন বেকার একই বছরে রোমা থেকে লিভারপুলে যোগ দেন ৭ কোটি ২৫ লাখ ইউরোতে। এই তালিকায় ৫ কোটি ইউরো ছাড়ানো গোলরক্ষকের সংখ্যা মাত্র চারজন। ২০২৩ সালে ৫ কোটি ২ লাখ ইউরোতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়েছিলেন আন্দ্রে ওনানা। ট্রাফোর্ডের দলবদল সম্পন্ন হলে তিনি হবেন পঞ্চম। অথচ একই সময়ে, ২০১৩ সালে গ্যারেথ বেলকে ১০ কোটি ইউরোতে এবং ২০১৬ সালে পল পগবাকে ১০ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে কিনেছিল রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এমনকি ডিফেন্ডার হ্যারি ম্যাগুয়ারের দাম ২০১৯ সালে ছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ইউরো।
এই বৈষম্যের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। লিভারপুলের প্রাক্তন গবেষণা পরিচালক ইয়ান গ্রাহামের মতে, গোলরক্ষকদের বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন। শট ঠেকানোর মতো মৌলিক বিষয় ডেটায় ধরা পড়লেও, ক্রস ধরতে বের হওয়া বা কর্নারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জটিল বিষয় বোঝার জন্য উন্নত ট্র্যাকিং ডেটা প্রয়োজন, যা বেশির ভাগ ক্লাবের নেই। অন্যদিকে, একজন নাম প্রকাশ না করা চ্যাম্পিয়নস লিগ ক্লাবের স্কাউট জানিয়েছেন, গোলরক্ষক সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অন্যান্য পজিশনের তুলনায় সীমিত। কেউ যদি স্বীকার করেন যে তিনি উইঙ্গার সম্পর্কে কিছু জানেন না, সেটি অস্বাভাবিক হলেও গোলরক্ষকের ক্ষেত্রে এই ধারণা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়।
বায়ার লেভারকুসেন ও ফেনারবাচের প্রাক্তন স্পোর্টিং ডিরেক্টর দেভিন ওজেক আরেকটি কারণ হিসেবে স্থিতিশীলতাকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, গোলরক্ষকের অবস্থানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ। একবার ভালো গোলরক্ষক সই করালে তিনি পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত দলে থাকতে পারেন। ফলে প্রতি মৌসুমে এই পজিশনে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। ইয়ান গ্রাহাম একমত পোষণ করে বলেন, শীর্ষ দলগুলোর প্রতি মৌসুমে নতুন ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডারের প্রয়োজন হলেও, নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক থাকলে পাঁচ বছরে একবারই নতুন ১ নম্বর গোলরক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে।
সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ মানের গোলরক্ষকের সংখ্যা কম, এবং যারা আছেন তারা অধিকাংশই ইতিমধ্যে শীর্ষ ক্লাবে খেলছেন। ফলে বাজারে তাদের প্রাপ্যতা কম। জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা গত বছর পিএসজি থেকে ম্যান সিটিতে গেলেও, তার বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ মানের গোলরক্ষকের বড় দলবদল খুব একটা দেখা যায়নি। এই সব মিলিয়ে গোলরক্ষকদের বাজার এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছে, যেখানে তারা অপরিহার্য হলেও তাদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।


