ফুটবলের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় এখন ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সিয়াটল রেইনের প্রধান কোচ লরা হার্ভি ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বীকার করেন, প্রতিপক্ষ দলকে হারানোর জন্য কোন ফরমেশনে খেলা উচিত—এমন প্রশ্ন তিনি চ্যাটজিপিটিকে করেছিলেন। এনডব্লিউএসএলের ১৪টি দলের মধ্যে দুটি দলের বিপক্ষে এআই পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলার পরামর্শ দিয়েছিল। হার্ভি সেই ধারণা কোচিং স্টাফের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে সিয়াটল রেইন পাঁচ ডিফেন্ডারের ব্যবস্থা ব্যবহার করে মৌসুম শেষ করে পঞ্চম স্থানে উঠে আসে, যা আগের বছরের তুলনায় আট ধাপ উন্নতি। রবিন ফ্রেজারও স্বীকার করেছেন, সম্ভাব্য ম্যাচ আপ ও ফরমেশন নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছেন।
তরুণ ফুটবলারের শারীরিক বিকাশ মূল্যায়নেও এআই নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের একাডেমিতে ১৬ বছর বয়সী কাভান সুলিভানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্লাবগুলো শুধু তাঁর বর্তমান খেলার মানই নয়, শরীরের পরিণত অবস্থা ও ভবিষ্যতের বিকাশের পথও জানতে চায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে শক্তি, শরীরের আকার ও সম্ভাব্য উচ্চতার পরীক্ষা করা হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও অনুমাননির্ভর। ফিট: ম্যাচ নামের একটি প্রযুক্তি স্মার্টফোনের মাধ্যমে চারটি ছবি তুলে ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ে একজন খেলোয়াড়ের উচ্চতা, শরীরের ভর, দুই হাতের প্রসার ও সম্ভাব্য শারীরিক গঠন সম্পর্কে ধারণা দেয়। প্রতিষ্ঠাতা হানিফ ব্রাউন একে ‘ফুটবলের চ্যাটজিপিটি’ বলে অভিহিত করেছেন। একই বয়সের দুজন খেলোয়াড়ের শারীরিক বিকাশের গতি ভিন্ন হতে পারে; এআইয়ের সাহায্যে এমএলএস ক্লাবগুলো এখন সেই পার্থক্য বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝে দেরিতে বিকশিত প্রতিভাবানদের জন্য উপযুক্ত পথ তৈরি করতে পারছে, যাতে তারা ব্যবস্থার বাইরে ছিটকে না পড়ে।
খেলোয়াড় নিয়োগের ক্ষেত্রেও এআই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোহাম্মদ সালাহ লিভারপুল ছেড়ে যাওয়ার পর তাঁর সম্ভাব্য বিকল্প খুঁজে বের করার কাজে মারকি নামের একটি এআইভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত হতে পারে। প্রতিষ্ঠাতা ডিন ব্রাখা জানান, শুধু গোল করতে পারেন এমন খেলোয়াড় খুঁজলেই হবে না; নতুন কোচের কৌশলের সঙ্গে মানানসই হতে হবে নতুন খেলোয়াড়কে। মারকি চ্যাটজিপিটির মতো অভিজ্ঞতা দিতে পারে, তবে এর পেছনে মেশিন লার্নিং মডেল কাজ করে যা নির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে মানানসই পাঁচ থেকে দশজন খেলোয়াড়ের তালিকা প্রস্তুত করে। ব্রাখার মতে, ফুটবল খাত গত এক দশকে তথ্যের ঘাটতি থেকে ডেটার আধিক্যে পৌঁছেছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা তথ্য ও জটিল স্প্রেডশিটের কাজ একত্র করে ক্লাবের বিশ্লেষণ বিভাগের মতো কাজ করে মারকি। গোল ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি প্রিমিয়ার লিগের কয়েকটি ক্লাব ব্যবহার করছে। বার্সেলোনা ও শিকাগো ফায়ারও এর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।
চোট পর্যবেক্ষণে এআইয়ের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। গত বছর মেজর লিগ সকারে ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে এফসি সিনসিনাটির ম্যাচে ম্যাট মিয়াজগার চলাচলে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করেছিল ক্লাবের প্রযুক্তি; বদলি হওয়ার অনুরোধের পাঁচ মিনিট আগেই সেই সংকেত এসেছিল। স্প্রিংবক অ্যানালিটিকস এমআরআই স্ক্যানের অসংখ্য দ্বিমাত্রিক ছবিকে এআই দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে পেশির ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল তৈরি করে। অ্যানালিটিকস পরিচালক ম্যাট ব্রাউন বলেন, এটি চোট সারানোর জাদুকরি সমাধান নয়; বরং জটিল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে চিকিৎসক ও পারফরম্যান্স বিভাগকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। চোটের সময়, দুই মাস বা ছয় মাস পর স্ক্যান করে পেশির ক্ষয় ও পুনর্বাসনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ সম্ভব। সাধারণত এক সপ্তাহ লাগা কাজটি এখন কয়েক ঘণ্টায় সম্পন্ন হয়।
তবে ফুটবলে এআই এখনো মানুষের জায়গা দখল করেনি। মারকির দেওয়া তালিকা থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ক্লাবের নিয়োগ বিভাগের। স্প্রিংবক চিকিৎসা করে না, শুধু পরিমাপ ও তথ্য সরবরাহ করে। কোচের ক্ষেত্রেও এআই একটি ধারণা দিতে পারে, কিন্তু সেই ধারণার বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব মানুষেরই। ফলে প্রযুক্তিটি এখনো একটি সহায়ক হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করছে, বিকল্প হিসেবে নয়।




