প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের ভূমিকায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় যাকে নিষ্ক্রিয় ও পরাধীন সত্তা মনে করা হতো, সেই দর্শক এখন নিজেই কনটেন্ট তৈরি করে 'প্রজিউমার'-এ পরিণত হয়েছে। বিটিভির সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে ভিসিআর, কেবল টিভি, রিমোট কন্ট্রোল এবং সবশেষে সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই টুলস—প্রতিটি ধাপে দর্শকের হাতে বেড়েছে পছন্দ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রযুক্তিগত নির্ণয়বাদ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রযুক্তি মানুষের চিন্তা, আচরণ ও সমাজ কাঠামোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে দেয়, যা আজকের দর্শকের বাস্তবতায় স্পষ্ট।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ এখন হলিউডের আলোচিত ছবি ক্রিস্টোফার নোলানের 'অডিসি'। মুক্তি পাওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটি ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক উন্মাদনা। নানা ভাষায় তৈরি হচ্ছে গ্রিক পুরাণ ও মহাকাব্যের গল্প নিয়ে বিশ্লেষণী পেজ ও রিলস। কেউ কেউ পুরোনো চিত্রকর্মের সঙ্গে ছবির স্টিল তুলনা করে পোস্ট করছেন, আবার অনেকে বিহাইন্ড দ্য সিন নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। তবে সবচেয়ে নজর কাড়ছে দর্শকদের তৈরি এআই-নির্মিত মিমস ও রিলগুলো। যেমন—একটি মিমে ট্রয়ের যুদ্ধে একদল সৈন্যের মাঝে একজন লম্বা-সুঠাম যুবককে যুদ্ধে না নেমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যার ক্যাপশনে লেখা, 'কেউ কেউ বিনা পরিশ্রমে এভাবেই মুফতে এ প্লাস পেয়ে যায়!' আরেকটি রিলে অডিসিয়াসকে ম্যাপ বাদ দিয়ে গুগল ম্যাপের সাহায্য নিতে দেখা যায়, যেখানে ভুল লোকেশনের বিড়ম্বনাকে কৌতুকের ছলে তুলে ধরা হয়েছে। এই সব কনটেন্ট দর্শকদের নিজেদের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ছবির চরিত্রদের মিলিয়ে তৈরি করার প্রবণতাকে দেখায়।
দর্শকদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ কিন্তু শুধু সৃজনশীলতার জায়গাতেই থেমে নেই। অ্যালগরিদমের সহায়তায় এই ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট (ইউজিসি) পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের ফিডে, আর একই সঙ্গে হয়ে যাচ্ছে ছবির বিনা পয়সার প্রচারণা। কেউ কেউ রাতারাতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে ইন্টিগ্রেটেড মার্কেটিংয়ের অংশও হয়ে যাচ্ছেন। অডিসির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। মুক্তি পাওয়ার অল্প সময়েই ছবিটি ওপেনহেইমারের মোট আয় ছাড়িয়ে যায়, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে 'স্পাইডারম্যান' তাকেও ছাপিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, অডিসির কেন্দ্রীয় অভিনেতা টম হল্যান্ড, জেনডায়া এবং জন বার্থনাল—তাঁরাই নতুন স্পাইডারম্যান ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় আছেন। ফলে অডিসির সাফল্য ও দর্শকদের তৈরি কনটেন্ট নতুন ছবিটির প্রচারণার জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলো দর্শকের আবেগ, মনোযোগ ও সৃজনশীলতাকে কীভাবে নিজেদের ব্যবসা বাড়ানোর কাজে লাগাচ্ছে, এর স্পষ্ট উদাহরণ এটি।
'উৎসব' কিংবা 'রইদ'-এর মতো ছবিকে ঘিরে বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরেও ইতিবাচক উন্মাদনা দেখা গেছে। দর্শকরা নিজেদের ভালো লাগা, নস্টালজিয়া এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা রকম কনটেন্ট তৈরি করছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—দর্শকের এই নতুন ক্ষমতায়ন কি সত্যিই তাঁর নিজের হাতে ক্ষমতা দিচ্ছে, নাকি এটি বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর আধিপত্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে? দর্শক আজ নিছক 'লোনলি ক্রাউড' নন; তিনি কনজিউমার, ক্রিয়েটর এবং প্রজিউমার। কিন্তু তাঁর তৈরি কনটেন্ট, আবেগ ও মনোযোগ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে—এই হিসাবটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার এই মানচিত্রে তাই দর্শকের ঠিকানা খোঁজা নয়, বরং দেখতে হবে সে কার গল্প বলছে এবং সেই গল্পের ক্ষমতা কার হাতে তুলে দিচ্ছে। ছোট ইন্ডাস্ট্রিগুলোর জন্য প্রয়োজন নিজেদের গল্প, মিথ ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এমন একটি শক্তিশালী যোগাযোগ-পরিসর গড়ে তোলা, যেখানে দর্শক শুধু অন্যের কনটেন্টের প্রচারক নয়, নিজের সংস্কৃতির প্রকৃত নির্মাতা ও প্রতিনিধি হয়ে উঠবে।




