ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের 'বিগ সিক্স' তকমাটি সর্বদা শীর্ষ ছয় ক্লাবকে নির্দেশ করলেও সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে শিরোপার মূল দ্বৈরথ সীমাবদ্ধ ছিল দুই থেকে তিনটি দলের মধ্যে। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি মূলত লিভারপুল কিংবা আর্সেনালের কাছ থেকেই মূল চ্যালেঞ্জ পেয়েছে। এদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি এবং টটেনহাম হোঁচট খেয়েছে নিজস্ব জটিলতায়। কিন্তু ২০২৬-২৭ মৌসুমের প্রাক্কালে পুরোনো সমীকরণ পাল্টানোর জোরালো ইঙ্গিত মিলছে।
বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চারটি বিশেষ কারণ, যেগুলোর নিরিখে বহুদিন পর প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড় এতটাই অনিশ্চিত দেখাচ্ছে।
প্রথমত, ডাগআউটে নতুন মুখের ছড়াছড়ি। সর্বশেষ নয় মৌসুমের ছয়টিতেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া ম্যানচেস্টার সিটি এবার ফেবারিট হিসেবে আবির্ভূত হলেও তাদের কোচিংয়ে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। ১০ বছরে ১৭টি প্রধান ট্রফি জিতে পেপ গার্দিওলা বিদায় নেওয়ায় দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক সহকারী এনজো মারেসকা। জানুয়ারিতে চেলসির কোচের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর এতদিন কোনো ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তিনি। অন্যদিকে, চেলসি নিজেও চেঞ্জরুমে পরিবর্তন এনেছে। মারেসকার বিদায়ের পর লিয়াম রোজেনিওরকে আনা হলেও মৌশন শেষের আগেই বরখাস্ত করে বায়ার লেভারকুসেনে অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়া লিভারপুলের সাবেক তারকা জাবি আলোনসোকে হোটস্পার্সের পরিচালক পদে বসায়। রিয়াল মাদ্রিদে তার সময়টা সুখকর না হলেও চেলসিতে প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। আর্ন স্লটের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে লিভারপুল সমর্থকরা আলোনসোকে ফেরাতে চেয়েছিল, কিন্তু ক্লাব শেষ পর্যন্ত আন্দনি ইরাওলার ওপরই আস্থা রেখেছে, যিনি গত মৌশনে বোর্নমাউথকে তালিকার ছয়ে তুলেছিলেন। এছাড়া মৌশনের মাঝপথে দায়িত্ব নেওয়া ম্যানইউয়ের মাইকেল ক্যারিক ও টটেনহামের রবার্তো দি জেরবিকেও নতুন মনে করা চলে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিগ সিক্সের মধ্যে একমাত্র ২০১৯ থেকে আর্সেনালের ম্যানেজার মিকেল আরতেতাই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
দ্বিতীয়ত, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ান আর্সেনালের জন্য উদ্বেগের নাম উইলিয়াম সালিবার ইনজুরি। ফ্রান্সের জার্সিতে বিশ্বকাপে চোট পাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণভাগের খেলোয়াড় দীর্ঘকাল বাইরে থাকবেন। গত মৌশনে সতীর্থ গ্যাব্রিয়েলের সাথে তার সেন্টার-ব্যাক জুটি ছিল দলের সর্বনিম্ন গোল খাওয়ার প্রধান অবলম্বন। পরিসংখ্যানও একে সমর্থন করে: ২০২২ সালে অভিষেকের পর সালিবা মাঠে থাকা ১৩১ ম্যাচের মধ্যে ৬৮.৭ শতাংশে জিতেছে আর্সেনাল, যেখানে তাকে ছাড়া খেলা ২১ ম্যাচে জয়ের হার মাত্র ৪৭.৬%। অ্যাস্টন ভিলা ও চেলসির বিপক্ষে শুরুতে তার অনুপস্থিতি গানারদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তৃতীয় কারণটি হলো ইউরোোপীয় ম্যাচের ভার ও তার প্রভাব। গত মৌশনে সর্বকম ৪০ ম্যাচ খেলে লিগ তৃতীয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বিপরীতে ৫৯ ও ৫২ ম্যাচ খেলা চেলসি ও টটেনহামের অবস্থান ছিল যথাক্রমে দশম ও সতেরোতে। কম ম্যাচ খেলার অর্থ হলো বিশ্রাম, কম ইনজুরি ও স্থিতিশীল একাদশ গঠনের সুযোগ। স্পাররা গতবার ইনজুরির আগ্রাসে জেরবার ছিল। তবে এবছর চেলসি ও টটেনহাম ইউরোপীয় কোনো আসরে নেই, যেখানে ম্যানইউ-সহ মোট ৯টি ক্লাবকে সেই বাড়তি চাপ সামলাতে হবে। ম্যানইউ মিডফিল্ডে আন্দ্রে সান্তোস ও ইউরি তিলেমানের মতো খেলোয়াড় এনেছে, তবুও দীর্ঘ মৌশনটাতে তা যথেষ্ট কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
সবশেষে, দলবদলের বাজারে বিস্ময় জাগিয়েছে চেলসি ও টটেনহাম। গত মৌশনের হতাশা ভুলতে দু’দলই মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। চেলসি অ্যাস্টন ভিলা থেকে মরগান রজার্সকে ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সাথে আতালান্তা থেকে এসেছেন মার্কো পালেস্ত্রা এবং ক্যারিয়ার আলোচনায় আছে ড্যানি ওয়েলবেকের মতো তারকারা। টটেনহাম এ গ্রীষ্মে ক্লাব রেকর্ড ২৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছেচে, মাএ দুই দিনের ব্যবধানে দুইবার নিজেদের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড ভেঙে। মাতেউস ফার্নান্দেস ও সান্দ্রো তোনালিকে আনা হয়েছে বিশাল মূল্যে, সাথে যুক্ত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
নতুন কৌচের স্ট্র্যাটেজি, অপরিচিত মুখ, সূচির ভিন্নতা ও বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট—সবকিছু মিলে এই প্রিমিয়ার লিগের শুরুতে কোনো একক দলকে স্পষ্ট চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চিহ্নিত করা দুরুহ। কয়েক মৌশন পরে ইংল্যান্ডের শিরোনা লড়াইয়ে সেই পুরোনো দিনের উন্মুক্ত রোমাঞ্চ ফিরে আসতে চলেছে।




