ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় টেস্ট ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে। দিনের প্রথম সেশনেই দলটি মাত্র ৩৫ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়ে ছয়টি উইকেট হারায়। এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বামহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক, যিনি ইনিংসের সপ্তম ওভারেই পাঁচটি উইকেট দখল করেন। মাত্র ২২ বলে সম্পন্ন হওয়া তাঁর এই স্পেলটি টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৯তম পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
স্টার্ক যদিও নিজের দ্রুততম রেকর্ডটি ভাঙতে পারেননি। এক ইনিংসে কোনো বোলারের দ্রুততম পাঁচ উইকেট নেওয়ার বিশ্বরেকর্ডটি এখনও তাঁর নামেই রয়েছে; গত বছরের ১৪ জুলাই কিংস্টনের স্যাবাইনা পার্কে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনি মাত্র ১৫ বলে এই সাফল্য অর্জন করেছিলেন। আজকের ম্যাকাইয়ের পিচেও তাঁর গতি ও সুইংয়ের কাছে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ একেবারেই টিকতে পারেনি।
ম্যাচের আগে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার পিচ কিউরেটর পিটার কাজাকফ—যিনি একসময় গ্যাবার সাবেক কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ফুটি মাঠকে নিজ হাতে ক্রিকেট উপযোগী করে তুলেছেন—জানিয়েছিলেন যে এখানকার উইকেট অত্যন্ত পেসবান্ধব। তাঁর ভাষায়, এটি ফাস্ট বোলারদের জন্য স্বর্গের মতো। স্টার্কের আজকের প্রদর্শনী সেই পূর্বাভাসকে সত্যি প্রমাণিত করেছে, ফলে কিউরেটরের মুখের হাসি আরও প্রশস্ত হয়ে উঠেছে।
খেলা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই মাঠের গ্যালারিগুলো প্রায় কানায় কানায় ভরে ওঠে। টেরি হেইসের নামে নামকরণ করা গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে উল্টো দিকের ছাদযুক্ত গ্যালারি এবং মাটির ঢিবি—সবখানেই ছিল দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। পার্কিং স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অনেকে সিটি সেন্টার কিংবা আশপাশের পাড়া-মহল্লার রাস্তা থেকে হেঁটে মাঠে পৌঁছান। শনিবার সকাল, যা সাপ্তাহিক ছুটির প্রথম দিন, তাতে ম্যাকাইয়ের রাস্তা এমন ব্যস্ততা সাম্প্রতিক অতীতে খুব কমই দেখেছে।
এই দর্শকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটার তাওহীদ, যিনি বাবা-মা ও ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন। নিজে ক্রিকেট খেলা এই কিশোর এর আগে বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে জালে বল করার সুযোগ পেয়েছেন এবং ইবাদত ও তাসকিনের সঙ্গে কথা বলে আপ্লুত হয়েছিলেন। তাঁর মতে, গত বছর এখানে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে ম্যাচের সময়ও মাঠে এত মানুষের ঢল নামেনি। আজকের ভিড় তার তুলনায় অনেক বেশি বলে তিনি জানান।
ম্যাকাইয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পা রাখার এই ঐতিহাসিক দিনটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন। সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেন থেকে আসা এসব দর্শক ভালো ক্রিকেট দেখার প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে বসেছেন। এখানকার ৩০ থেকে ৩৫টি বাংলাদেশি পরিবারেরও প্রায় সকলেই মাঠে উপস্থিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ডারউইনের টেস্ট জয়ের পর উজ্জীবিত তারা জানিয়েছেন, সিরিজের ফলাফল অমীমাংসিত হলেও কিংবা সিরিজ না জিতলেও তারা অখুশি হবেন না। তবে তাদের প্রধান চাওয়া—বাংলাদেশ যেন মানসম্মত ক্রিকেট খেলুক। একজন দর্শক বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে সিরিজ জিততে না পারাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়াও যদি সিরিজ না জেতে—তাতেই তাঁর খুশি। শুধু চাই, দলটি ভালো খেলুক।
ম্যাচ শুরুর আগে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ‘এল্ডার আন্টি’ ডেব ক্লার্ক বক্তব্য রাখেন। তিনি ম্যাকাইয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে স্বাগত জানিয়ে সুন্দর খেলাধুলার আশা প্রকাশ করেন। মাঠের ভেতরে অস্ট্রেলিয়ানদের দৃষ্টিতে সেটাই ঘটছে—অন্তত প্রথম দিনের প্রথমার্ধে। মাঠের বাইরে টেস্টকে বরণ করে নেওয়ার বর্ণাঢ্য পরিবেশও ছিল লক্ষণীয়। অল্প কিছু বাংলাদেশি দর্শকের বিষাদ বাদ দিলে, স্টার্ক ও কিউরেটরের মতোই অধিকাংশ মানুষের মুখে ছিল হাসি—যারা এই ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হতে পেরে আনন্দিত।




