বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার শুক্রবার ৮৫ বছরে পা দিয়েছেন। জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক নিবিড় আয়োজনে তাঁর স্মৃতিচারণ করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলের মানুষজন। এ সময় তাঁর বহুমাত্রিক কর্মময় জীবন নিয়ে লেখা 'রামেন্দু মজুমদার: স্টেজিং আ লাইফটাইম, আ পিকটোরিয়াল ক্রনিকল' শীর্ষক বইটিও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্টজনেরা।

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাংবাদিক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা জানান, রামেন্দু মজুমদার তাঁর খালু হলেও তিনি আজীবন তাঁকে 'কাকা' সম্বোধন করেছেন। ১৯৭০ সালে তাঁর খালার সঙ্গে রামেন্দু মজুমদারের বিয়ে হয়, তবে তারও আগে থেকে তাঁর নানুবাসায় যাতায়াত ছিল। সে সময় তাঁকে খালু ডাকার সুযোগ না থাকায় 'কাকা' সম্বোধনটিই থেকে যায়।

শৈশবের এক স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ষাটের দশকের শেষ দিকে একদিন নানুবাসার ছাদে কাজিনরা প্রেম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেই আলোচনায় তিনি তুলনা করেছিলেন ফেরদৌসী খালা ও রামেন্দু কাকার সম্পর্ককে। তিনি বলেছিলেন, তাঁদের প্রেম যেন 'ফেরদৌসী, দেখো, আজ কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে' - এমন নাটকীয় আবহে ঘেরা।

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় তাঁর খালা ফেরদৌসী তাঁকে বাংলা ও ইসলামিয়াত পড়াতেন। সে সময় রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী ইন্দিরা রোডের এক বাসায় থাকতেন। স্কুল বন্ধের দিনগুলোতে তিনি সেখানে কাটাতেন। সন্ধ্যায় খাবার টেবিলে রামেন্দু কাকা ও পিচ্চি খালার নাটকের সংলাপ চর্চা শুনে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতেন। তখন থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর আগ্রহের সূত্রপাত।

রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে বেশিরভাগ স্মৃতিই যে নীরব, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি কথা কম বলেন, কিন্তু ছোটদের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অকৃত্রিম। ঈদের দিনে নানুবাসায় সবাই জড়ো হতেন, আর রামেন্দু কাকা এসে ছোটদের টাকা দিতেন, যা ছিল আইসক্রিম খাওয়ার জন্য দারুণ প্রাপ্তি।

পারিবারিক জীবনের নানা প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, রামেন্দু মজুমদারের যত্ন নেওয়ার একটি সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে। তাঁর খালা টাকাপয়সার হিসাব রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না, তাই মাসের শুরুতে খাতা ধরে খামে টাকা ভাগ করে দিতেন রামেন্দু কাকা।

পরবর্তী সময়ে ৩৫ তোপখানা রোডে বিটপী সংস্থার অফিসটি তাঁদের কাছে পরিবারের মতোই ছিল। সেখানে দোতলায় রামেন্দু কাকার ঘর ছিল মানুষের সরগরম। তিনি জানান, রামেন্দু মজুমদারের রসবোধ শুকনো ধরনের, মন্তব্য ছোট কিন্তু মোক্ষম।

তিনি আরও স্মরণ করেন, এমএ পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর রামেন্দু কাকা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সেই সময়' বইটি উপহার দিয়েছিলেন। বইয়ের এক খণ্ডে লেখা ছিল 'মিতি/কী আশ্চর্য!' আরেকটিতে 'কী দরকার ছিল এত ভালো ফল করার!'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিলে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষকতা ছেড়ে দিলে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর মা দিলারা বেগম রামেন্দু মজুমদারের কাছে 'দিলাপা' নামে পরিচিত ছিলেন। আর তাঁর নিজের নাম রেখেছিলেন 'মিতি আপু'। শৈশবে বিদায়ের সময় সিঁড়িতে দুই হাত ঘুরিয়ে তিনি ছোটদের সামনে একটু নেচে নিতেন। সেই স্মৃতির কথা মনে করে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, এখন অনেক দিন সেই নাচ দেখা হয় না। তিনি চান, আবার একবার যেন সেই নাচ দেখতে পান।