আজ থেকে ৮১ বছর আগে, ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে নিউ মেক্সিকোর অ্যালামোগোর্ডো বিমানঘাঁটির মরুভূমিতে মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দেওয়া এক ঘটনা ঘটে। সেখানে মার্কিন সেনাবাহিনী 'ট্রিনিটি টেস্ট' নামে প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়, যা ইতিহাসে 'দ্য গ্যাজেট' নামে পরিচিত এক প্লুটোনিয়াম ইমপ্লোশন ডিভাইস দিয়ে চালানো হয়েছিল। বিস্ফোরণটির তীব্রতা ছিল প্রায় ২১ কিলোটন টিএনটির সমান, যা মুহূর্তের মধ্যে ৩০ মিটার উচ্চতার পরীক্ষার টাওয়ারসহ চারপাশের ধাতব যন্ত্রপাতি বাষ্পীভূত করে দেয়। আকাশে তৈরি হয় বিশাল মাশরুম ক্লাউড, যা ৪০ হাজার ফুট উঁচুতে ছড়িয়ে পড়ে।
এর পেছনে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত অত্যন্ত গোপনীয় 'ম্যানহাটান প্রজেক্ট'। ১৯৩৯ সালের শুরুর দিকে পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে সামরিক উদ্দেশ্যে ফিশনযোগ্য পদার্থের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। একই বছর লিও সিলার্ড ও আলবার্ট আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টকে একটি চিঠি পাঠিয়ে অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়ার ভয়াবহ সামরিক সম্ভাবনার কথা জানান। ১৯৪২ সালে যুদ্ধ বিভাগ প্রকল্পটির ওপর থেকে সব সীমাবদ্ধতা তুলে নেয় এবং ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল লেসলি গ্রোভসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। জে রবার্ট ওপেনহেইমারের নেতৃত্বে লস আলামোসে 'প্রজেক্ট ওয়াই'-এর অধীনে হ্যান্স বেথে, এডওয়ার্ড টেলার ও ফার্মির মতো বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সমস্যা সমাধান করেন।
মজার বিষয় হলো, এই প্রকল্পে মোট প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ কাজ করেছিলেন, অর্থাৎ তৎকালীন প্রতি ২৫০ জন মার্কিন নাগরিকের একজন প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। টেনেসির ওক রিজ ও ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ড ওয়ার্কসের মতো বিশাল কারখানায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের কাজ চললেও অধিকাংশ শ্রমিক জানতেন না তাঁরা আসলে কী তৈরি করছেন। বিস্ফোরণের পর লস আলামোসের বিজ্ঞানীদের অনুভূতি ছিল মিশ্র। প্রকল্পের অন্যতম পদার্থবিদ জোন হিন্টন সাক্ষাৎকারে জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তাঁরা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা শুরু করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন যেন পুরো পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছেন।
বিস্ফোরণের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। মূলত জার্মানিই ছিল প্রথম লক্ষ্য, কিন্তু ততক্ষণে জার্মানি আত্মসমর্পণ করায় একমাত্র জাপান যুদ্ধরত দেশ হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। ট্রিনিটি পরীক্ষার ৮০ বছরের বেশি সময় পর সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিস্ফোরণস্থলে 'ক্যালসিয়াম কপার সিলিকেট টাইপ-১ ক্ল্যাথ্রেট' নামে এক ধরনের নতুন স্ফটিক খুঁজে পেয়েছেন, যা স্বাভাবিক অবস্থায় পৃথিবীতে টিকে থাকা অসম্ভব। ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ লুকা বিন্দির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের এই দল বিস্ফোরণের তীব্র তাপ (প্রায় ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও চাপে (৫ থেকে ৮ গিগাপাসকাল) সৃষ্ট 'ট্রিনিটাইট'—বালি, অ্যাসফল্ট ও তামা মিশ্রিত কাচজাতীয় পদার্থের মধ্যে এই স্ফটিকের সন্ধান পান। এর আগে ২০২১ সালে একই স্থানে 'কোয়াসিক্রিস্টাল' পাওয়া গিয়েছিল।
ট্রিনিটি পরীক্ষার প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতেও গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৫৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা কমলে সাইটটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় এবং এটি বর্তমানে একটি জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান। পারমাণবিক যুগের সূচনার প্রতীক হিসেবে ১৯৫৪ সালে 'অ্যাটমিক ফায়ারবল' নামে ক্যান্ডি বাজারে আসে। ধ্বংসের পাশাপাশি বিজ্ঞানের জন্যও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়; ম্যানহাটান প্রজেক্টের রিঅ্যাক্টরে উৎপাদিত কার্বন-১৪ ব্যবহার করে মেলভিন কেলভিন ১৯৬১ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে এই ভয়াবহতা রুখতে ১৯৯৬ সালে 'কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট ব্যান ট্রিটি' (সিটিবিটি) চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, যা পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের লক্ষ্যে কাজ করছে।


