বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস আগামী গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। গত ২৯ জুলাই এক বিবৃতিতে তারা জানায়, গ্র্যামির নতুন একটি ক্যাটাগরি যুক্ত করার প্রতিবাদে তারা নিজেদের কোনো গান জমা দেবে না। ব্যান্ডের দাবি, এই নতুন বিভাগ সংগীতের বৈশ্বিক রূপকে একটি নির্দিষ্ট সীমানায় বন্দী করে রাখছে।
ব্যান্ডের সদস্যরা জানান, সংগীত যেন কোনো অঞ্চল বা ভাষার সীমারেখায় আবদ্ধ না থাকে, সেটাই তাদের প্রত্যাশা। মানুষ যেন কেবল গান হিসেবেই তা উপভোগ করতে পারে। ৬৯তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের বিভাগ পরিবর্তনের জবাব হিসেবেই মূলত এই অবস্থান নেওয়া হয়েছে। গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে রেকর্ডিং একাডেমি নতুন কয়েকটি বিভাগ যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। আগামী বছর ৭ ফেব্রুয়ারি এই আসরের মূল অনুষ্ঠানটি আয়োজনের কথা রয়েছে।
নতুন বিভাগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’। এশীয় অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিতে তৈরি পপ গানকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিভাগটি চালু করা হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন আয়োজকরা। কে-পপ, জে-পপ ও সি-পপসহ এশিয়ার বিভিন্ন ধরনের পপ সংগীতকে এই বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিটিএসের এই ঘোষণার পর রেকর্ডিং একাডেমির প্রধান নির্বাহী হার্ভি মেসন জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, ব্যান্ডটির সিদ্ধান্তে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত। তবে তিনি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, নতুন ‘এশিয়ান পপ’ বিভাগটি এশীয় সংগীতের বৈচিত্র্য ও বিস্তার উদযাপনের জন্যই আনা হয়েছে। এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের কাজ যেন আলাদাভাবে স্বীকৃতি পায়, সেটাই এর লক্ষ্য। কাউকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে এই বিভাগ চালু করা হয়নি; বরং গ্র্যামির ১৫ হাজার ভোটারের স্বীকৃতির পরিধি বাড়িয়ে আরও শিল্পীকে সুযোগ দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশেষ বিভাগে গান জমা দিলেও শিল্পীরা সেরা গান, সেরা অ্যালবাম বা সেরা রেকর্ডের মতো প্রধান পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে ‘ডায়নামাইট’ গানের মাধ্যমে প্রথম কোরিয়ান ব্যান্ড হিসেবে গ্র্যামিতে মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়েছিল বিটিএস। দীর্ঘ বিরতির পর চার্ট কাঁপানো অ্যালবাম নিয়ে ফিরেও গ্র্যামিতে গান না পাঠানোর সিদ্ধান্ত সংগীত জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তবে ভবিষ্যতে তারা আবারও গান জমা দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানানো হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কে-পপের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে মার্কিন সংগীত পুরস্কার সংস্থাগুলো নতুন নতুন বিভাগ চালু করছে। ২০১৯ সালে এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস চালু করে ‘বেস্ট কে-পপ’ বিভাগ। ২০২২ সালে আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস যোগ করে ‘ফেভারিট কে-পপ আর্টিস্ট’ এবং ২০২৩ সালে বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস কে-পপ নিয়ে নতুন চারটি বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করে। বিটিএস ইতিমধ্যে এএমএ ও ভিএমএসহ বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত সংস্থা থেকে বহু পুরস্কার জিতেছে। তবে গ্র্যামিতে ‘বেস্ট পপ ডুও/গ্রুপ পারফরম্যান্স’ বিভাগে তিনবার এবং ‘বেস্ট মিউজিক ভিডিও’ বিভাগে একবার মনোনীত হলেও এখন পর্যন্ত পুরস্কার জিততে পারেনি তারা। কোল্ডপ্লের ‘মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ার্স’ অ্যালবামের একটি গানে বিটিএসের অংশগ্রহণ ছিল, যা ২০২২ সালে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল। গ্র্যামির মঞ্চে তারা তিনবার পারফর্মও করেছে।
গ্র্যামি বর্জনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালে গায়ক ‘দ্য উইকেন্ড’ গোপন কমিটির মাধ্যমে মনোনয়ন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলে নিজের গান জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে রেকর্ডিং একাডেমি ভোটিং নীতিমালা সংস্কার করলে তিনি আবারও অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন।
২০২২ সালে বিটিএস সাময়িক বিরতিতে যায় এবং সদস্যরা একক কাজ ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় মনোযোগ দেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব সক্ষম পুরুষকে কমপক্ষে ১৮ মাস সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। চার বছরের বিরতি শেষে মার্চ মাসে সিউলে এক বিশাল কনসার্টের মাধ্যমে মঞ্চে ফেরে ব্যান্ডটি। এ সময় তাদের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’ প্রকাশিত হয়, যা বিলবোর্ড ২০০ চার্টের শীর্ষস্থান দখল করে এবং প্রায় ১১৫টি দেশ ও অঞ্চলের অ্যাপল মিউজিক চার্টে প্রথম স্থানে পৌঁছায়।
গ্র্যামির দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এই পরিবর্তনের আভাস মিলেছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে এক ম্যাগাজিন সাক্ষাৎকারে বিটিএসের আরএম জানান, গ্র্যামি পাওয়ার ইচ্ছা এখন আর আগের মতো নেই। ক্যারিয়ারের শুরুতে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা ভালো ছিল, যা সবাইকে একসূত্রে বাঁধত। তবে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সাতজন আবার একসঙ্গে ফিরে এসেছে এবং বিশ্বের ভক্তদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারছে।




