কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের ওকানাগান অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো বাসিন্দা। শুক্রবার (৭ আগস্ট) বোল্ড রেঞ্জ এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা ১৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়। সোমবার (১০ আগস্ট) পর্যন্ত এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি প্রশাসন।
পিচল্যান্ড এলাকার বাসিন্দা আর্ল কার্জ ও তার স্ত্রী তিন দশক ধরে ওকানাগান লেকের পাশে বসবাস করছেন। গত ১০ বছরে দাবানলের হুমকির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখলেও, এবারই প্রথম তাদের এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়েছে। বাড়ি ফিরে ক্ষতির পরিমাণ দেখে তিনি বলেছেন, "পুরোটাই পুড়ে ছাই। আগুনের দাগগুলো এখন শুধুই ১২ ইঞ্চি পুরু ছাইয়ে ভরা জনশূন্য এলাকা।"
শুধু পিচল্যান্ড নয়, সাত সমারল্যান্ড শহর থেকেও হাজারো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৮ বছর বয়সী কিগান রাডমস্কি জানান, মায়ের দেহভস্ম নিয়ে সবে বাড়ি থেকে বের হতে পেরেছিলেন তিনি, এর মধ্যেই আগুন তাদের সম্পত্তি গ্রাস করে ফেলে। তার পরিবারের বাড়িটি ৩০ বছর আগে তার দাদি তৈরি করেছিলেন। শুক্রবার রাতের খাবার টেবিলে বসে দূরের ধোঁয়া দেখতে পান তারা। চার ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বাড়ির পাশের পাহাড়ে আগুন জ্বলতে দেখে সপরিবারে পালাতে বাধ্য হন তারা।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি সপ্তাহান্তে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নির্দেশ মানার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেছেন যে, আগুন "অবিশ্বাস্য গতিতে" ছড়িয়ে পড়ছে। এই অঞ্চলে সোমবার পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি দাবানল সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টিই গত এক সপ্তাহে শুরু হয়েছে।
বোল্ড রেঞ্জের আগুনের আগে একই অঞ্চলের ব্র্যাডলি ক্রিক দাবানলে ২০০টির বেশি বাড়ি পুড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্রুদের নিরলস প্রচেষ্টায় সেই আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ওকানাগান অঞ্চল তার বিশ্ববিখ্যাত আঙ্গুর বাগান ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এলাকা প্রচণ্ড খরার সম্মুখীন হচ্ছে। ওকানাগান বেসিন ওয়াটার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ওকানাগান লেকের পানির উচ্চতা ১৯৯২ সালের পর সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। খরার কারণে দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যেও দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
শুধু উত্তর আমেরিকা নয়, ইউরোপেও দাবানলের তাণ্ডব চলছে। স্পেন ও ফ্রান্সে গ্রীষ্মকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিধ্বস্ত হয়েছে। ফ্রান্সে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা গেছে, আর মাদ্রিদের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের অঞ্চলে এটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার বিশাল বোরিয়াল বনের প্রাকৃতিক চক্রের অংশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরা পরিস্থিতি গত এক দশকে দাবানলগুলোকে আরও তীব্র ও ঘন ঘন ঘটিয়ে তুলছে। ২০২৩ সালে পুড়ে যাওয়া মোট এলাকার নিরিখে দেশটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল মৌসুম দেখেছিল।
উচ্ছেদকৃত রাডমস্কি এখনও জানেন না, তার বাড়িটি টিকে আছে কিনা। কবে ফিরে গিয়ে তা দেখতে পারবেন, তাও নিশ্চিত নন তিনি। "আগেও অনেকবার কাছাকাছি বিপদ এসেছে, কিন্তু এমনটা কখনও ঘটেনি। সবসময় ভাবি, এটা তো আমাদের ক্ষেত্রে ঘটবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটলো," বলেছেন তিনি।




