সংগীত জগতের ইতিহাসে বন্ধুত্ব ও ব্যবসার এক বিচিত্র অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ১৯৮০-এর দশকে। পপের রাজা মাইকেল জ্যাকসনকে শুধু গান গাওয়া নয়, গানের প্রকাশনাস্বত্বের মালিকানায় বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন তারই বন্ধু পল ম্যাকার্টনি। সেই পরামর্শই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তখন কেউই বুঝতে পারেনি। জ্যাকসন তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। ম্যাকার্টনির দেওয়া সেই পরামর্শ মাথায় রেখেই তিনি একদিন মজা করে বলেছিলেন, 'একদিন তোমার গানগুলো কিনে নেব।' ম্যাকার্টনি সেটিকে নিছক রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে সত্যি সত্যিই এমন এক ক্যাটালগ কিনে ফেলেন জ্যাকসন, যাতে ছিল বিটলসের দুই শতাধিক গান। ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের বিশাল অঙ্কে এটিভি মিউজিকের ক্যাটালগটি অধিগ্রহণের মাধ্যমে এসব গানের প্রকাশনাস্বত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে তার হাতে। উল্লেখ্য, এই কেনাকাটা চূড়ান্ত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ১০ আগস্ট এবং চার দিন পর অর্থাৎ ১৪ আগস্ট প্রকাশ্যে আসে সেই অধিগ্রহণের খবর। আজ সেই ঘটনার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও গল্পটি এখনও প্রাসঙ্গিক, কারণ সময়ের ব্যবধানে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের সেই বিনিয়োগের মূল্য এখন শত কোটি ডলারের ঘরে পৌঁছেছে।

বিটলসের গানগুলোর মালিকানা নিয়ে জটিল গল্পের শুরু অবশ্য ১৯৬৩ সালে, যখন ব্যান্ডটির গান প্রকাশের জন্য গড়ে ওঠে নর্দান সংস। প্রকাশক ডিক জেমস এবং জন লেনন ও পল ম্যাকার্টনি ছিলেন এর সঙ্গে যুক্ত। প্রাথমিকভাবে লেনন ও ম্যাকার্টনি প্রতিষ্ঠানটির ২০ শতাংশ করে মালিকানা পেলেও ১৯৬৫ সালে কোম্পানিটি পাবলিক হলে তাদের অংশ ১৫ শতাংশে নেমে আসে। এরপর ডিক জেমসের সঙ্গে বিটলসের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ১৯৬৯ সালে তিনি নর্দান সংসে তার অংশ এটিভি মিউজিকের কাছে বিক্রি করে দেন। লেনন ও ম্যাকার্টনি নিজেদের অংশ ধরে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অংশও এটিভির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে নিজেদের লেখা গানের প্রকাশনাস্বত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান বিটলসের দুই প্রধান গীতিকার, যার খেসারত তাদের বহু বছর দিতে হয়েছে।

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে মাইকেল জ্যাকসনের সাথে ম্যাকার্টনির বন্ধুত্বের সূচনা হয়। ম্যাকার্টনির লেখা 'গার্লফ্রেন্ড' গানটি প্রথমে তার ব্যান্ড উইংসের ১৯৭৮ সালের 'লন্ডন টাউন' অ্যালবামে প্রকাশিত হয়, পরে ১৯৭৯ সালে জ্যাকসনের 'অফ দ্য ওয়াল' অ্যালবামে গানটির আরেকটি সংস্করণ আসে। এরপর তাদের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয় এবং ১৯৮২ সালে তারা যৌথভাবে 'দ্য গার্ল ইজ মাইন' গানটি করেন। এই সময়েই সংগীতের ব্যবসা নিয়ে তাদের কথাবার্তা হয়। ম্যাকার্টনি জ্যাকসনকে বোঝান, একজন শিল্পীর জন্য নিজের গানের প্রকাশনাস্বত্বের মালিকানা কতটা জরুরি এবং মিউজিক পাবলিশিং কতটা লাভজনক একটি ব্যবসা। পরে ম্যাকার্টনি স্মরণ করে বলেছেন, জ্যাকসন তখন তাকে বলেন, 'একদিন আমি তোমারগুলো কিনে নেব।' ম্যাকার্টনি ভেবেছিলেন তিনি মজা করছেন, কিন্তু তিনি যে মজা করছেন না, তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি।

১৯৮৫ সালে এটিভি মিউজিকের ক্যাটালগ বিক্রির জন্য তোলা হলে তাতে ছিল প্রায় চার হাজার গান, যার মধ্যে ছিল লেনন-ম্যাকার্টনির লেখা দুই শতাধিক গান। ম্যাকার্টনি ক্যাটালগটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন এবং ইয়োকো ওনোর সাথে যৌথভাবে কেনার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জ্যাকসনের দেওয়া দামের সাথে তারা পেরে ওঠেননি। ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে ক্যাটালগটি কিনে নেন জ্যাকসন, যা তৎকালীন সময়ে বিশাল অঙ্ক হলেও পরে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বিচক্ষণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়। তিনি শুধু গানের একটি তালিকাই কেনেননি, বরং এমন সব গানের প্রকাশনাস্বত্বের অধিকার কিনেছিলেন যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাজবে, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হবে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গাইবেন।

ম্যাকার্টনির কষ্ট শুধু ব্যবসায়িকভাবে হেরে যাওয়ার কারণে ছিল না, বরং যে মানুষটিকে তিনি মিউজিক পাবলিশিংয়ের গুরুত্ব বোঝিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটির কাছেই নিজের লেখা গানের প্রকাশনাস্বত্ব হারান। জ্যাকসনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ম্যাকার্টনি মন্তব্য করেছিলেন, 'আমার কাছে ব্যাপারটা একটু অনৈতিক মনে হয়। কারও বন্ধু হয়ে, তারপর সেই বন্ধুর পায়ের নিচের মাটিটাই কিনে নেওয়া—এটা ঠিক নয়।' বিটলসের আরেক সদস্য জর্জ হ্যারিসনও ১৯৮৮ সালে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই সিদ্ধান্তকে অদ্ভুত বলে উল্লেখ করেন, কারণ জ্যাকসন তো ম্যাকার্টনির বন্ধু ছিলেন।

ক্যাটালগ কেনার পরপরই ম্যাকার্টনি ও জ্যাকসনের সম্পর্ক ভেঙে যায়নি, তবে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়। ম্যাকার্টনি নিজের গানগুলোর স্বত্ব ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করলেও সেই অর্থ তার নাগালের বাইরে ছিল। তিনি একসময় জ্যাকসনের কাছে নিজের লেখা গানগুলোর জন্য আরও বেশি রয়্যালটির অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু জ্যাকসনের উত্তর ছিল—'ওহ পল, এটা তো শুধু ব্যবসা।' ২০০৯ সালে ডেভিড লেটারম্যানের অনুষ্ঠানে ম্যাকার্টনি জানান, তিনি আশা করেছিলেন জ্যাকসন তার ও লেননের লেখা গানগুলোর জন্য ভালো আর্থিক সমঝোতায় আসবেন, কিন্তু তা আর হয়নি। তাদের মধ্যে বড় কোনো প্রকাশ্য ঝগড়া না হলেও তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছিলেন।

১৯৯৫ সালে জ্যাকসন এটিভির সংগীত প্রকাশনা ব্যবসা সনির সাথে একীভূত করে সনি/এটিভি মিউজিক পাবলিশিং কোম্পানি গঠন করেন, যেখানে দুই পক্ষেরই মালিকানা ছিল ৫০-৫০। এর ফলে ক্যাটালগের মূল্য আরও বাড়তে থাকে। জ্যাকসনের জীবনের শেষ দিকে বিপুল ঋণ থাকলেও সনি/এটিভিতে তার অংশ ছিল অন্যতম মূল্যবান সম্পদ; ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী তার অংশের মূল্য ছিল প্রায় ৩৯ কোটি ডলার। ২০০৯ সালে জ্যাকসনের মৃত্যুর পর সনি/এটিভিতে তার মালিকানাধীন ৫০ শতাংশ অংশ তার এস্টেটের নিয়ন্ত্রণে যায়। ২০১৬ সালে সনি জ্যাকসনের এস্টেটের হাতে থাকা সেই ৫০ শতাংশ অংশ প্রায় ৭৫ কোটি ডলারে কিনে নেয়, ফলে সনি/এটিভির একক মালিক হয় সনি। তবে এটি জ্যাকসনের সব সংগীতসম্পদ বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল না; তার সংগীতসম্পদের বিভিন্ন অংশের মালিকানা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল।

গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মার্কিন কপিরাইট আইন ১৯৭৬-এর মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট শর্তে গীতিকারদের বহু বছর আগে হস্তান্তর করা কপিরাইট পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। বিটলসের গানগুলো প্রকাশের বছর অনুযায়ী ধাপে ধাপে সেই সময়সীমায় পৌঁছালে ম্যাকার্টনি ২০১৬ সালে সনির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের লেখা কিছু গানের স্বত্ব ফেরত পাওয়ার আইনি উদ্যোগ নেন। ২০১৭ সালে দুই পক্ষ গোপন সমঝোতায় পৌঁছায় এবং মার্কিন আইনের আওতায় ম্যাকার্টনির লেখা বিটলসের নির্দিষ্ট কিছু গানের স্বত্ব তার কাছে ফিরে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বের সব দেশে তিনি পুরোপুরি স্বত্ব ফিরে পেয়েছেন, কারণ মার্কিন কপিরাইট আইনের অধিকার এবং অন্যান্য দেশের মালিকানাকাঠামো এক নয়।

মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পরও তার সংগীতসম্পদের মূল্য বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে সনি মিউজিক জ্যাকসনের সংগীতসম্পদের একটি বড় অংশ প্রায় ৬০ কোটি ডলারে কেনার খবর বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, যেখানে সংগীতসম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও চূড়ান্ত মূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি প্রকাশ না হলেও এতে জ্যাকসনের সংগীতের প্রকাশনাস্বত্ব, মাস্টার রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন সম্পদ ছিল। সেই ক্যাটালগে স্লাই অ্যান্ড দ্য ফ্যামিলি স্টোনের বহু গানের প্রকাশনা স্বত্বসহ জেরি লি লুইস, জ্যাকি উইলসন, কার্টিস মেফিল্ড, রে চার্লস, পার্সি স্লেজ ও ডায়নের মতো শিল্পীদের গানও রয়েছে।

সম্প্রতি মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা 'মাইকেল' তার সংগীতের জনপ্রিয়তায় নতুন ঢেউ তুলেছে। লুমিনেটের ২০২৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিনেমা মুক্তির আগের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে জ্যাকসনের গানের অন-ডিমান্ড অডিও স্ট্রিমিং ছিল ৪ কোটি ৯৯ লাখ, যা মুক্তির সপ্তাহে বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি ১৬ লাখে—এক সপ্তাহেই ১৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি। মুক্তির দুই সপ্তাহ পর সাপ্তাহিক স্ট্রিমিং সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ২০ লাখে পৌঁছায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। সিনেমা মুক্তির চার সপ্তাহ পরও সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্ট্রিমিং কমেছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। এই প্রবণতার সঙ্গে ২০১৮ সালের 'বোহেমিয়ান র্যাপসোডি' সিনেমার পর কুইনের গানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মিল পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে 'মাইকেল' শুধু পুরোনো শ্রোতাদেরই ফিরিয়ে আনেনি, বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও জ্যাকসনের সংগীত পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। সেই ১৯৮৫ সালের ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগগুলোর একটি হয়ে ওঠে।