দেশের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান মুখ রামেন্দু মজুমদার গতকাল রোববার তাঁর ৮৬তম জন্মদিন উদযাপন করেছেন। এই উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে সন্ধ্যায় এক বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কর্মময় জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি দ্বিভাষিক ছবির বই। ‘ইচ্ছাপূরণ’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া ‘রামেন্দু মজুমদার: স্টেজিং আ লাইফটাইম, আ পিক্টোরিয়াল ক্রনিকল’ শিরোনামের এই বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করল প্রকাশনা সংস্থাটিও।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ছায়া কর্মকারের কণ্ঠে রামেন্দু মজুমদারের প্রিয় গান ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু/ কম করে মোরে দাওনি’ পরিবেশনার মাধ্যমে। প্রকাশক ও সম্পাদক ত্রপা মজুমদার জানান, প্রায় এক দশক ধরে এমন একটি বই প্রকাশের পরিকল্পনা ছিল তাদের। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো। বইটিতে স্থান পেয়েছে প্রায় ২০০টি ছবি এবং দশটির বেশি লেখা। তাঁর বহুমুখী কর্মজীবনের বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরা কঠিন হলেও ছবিগুলো থেকে বাছাই করে কর্মময়তার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। বইয়ের লেখকরা তাঁর সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে বইটির মূল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বইয়ের ছবিগুলো সাতটি পর্বে সাজানো হয়েছে বলে জানান ত্রপা মজুমদার। প্রথম পর্বে লক্ষ্মীপুরে তাঁর জন্ম ও শিক্ষাজীবন, এরপর থিয়েটার চর্চা ও বিকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপন সংস্থায় পেশাগত জীবন, নাটক, চলচ্চিত্র ও বেতার-টেলিভিশনে খবর পাঠের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তুলে ধরা হয়েছে। শেষের পর্বগুলোতে ব্যক্তিজীবন এবং সাংগঠনিক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড স্থান পেয়েছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ প্রসঙ্গে ত্রপা মজুমদার জানান, তাঁর মেয়ে ‘ইচ্ছা’র নাম অনুসারে এই নামকরণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তারা বই নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালক আপন আহসান রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে এমন কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে বলেন। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সম্পাদক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে তাঁর ৪০ বছরের সম্পর্ক ছিল। তিনি সাধারণত জন্মদিন পালন করেন না বলে জানিয়ে দেবনাথ বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের নাট্যজগতে তিনি বটবৃক্ষের মতো। তিনি নাট্যকর্মীদের হৃদয় দিয়ে কাজ করতে শিখিয়েছেন এবং দেশে আধুনিক নাট্যচর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত। আইটিআইয়ের সভাপতি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাটককে পরিচিত করে তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন সংস্থা বিটপীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারাহ আলী বলেন, রামেন্দু মজুমদার অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও মেধাবী মানুষ। তাঁর বাবা রেজা আলীর সঙ্গে রামেন্দু মজুমদার বিটপীর মাধ্যমে দেশে বিজ্ঞাপন শিল্পের সৃজনশীল কাজকে বহুদূর প্রসারিত করেছেন। তরুণ থিয়েটার কর্মী শেকানুল ইসলাম বলেন, রামেন্দু মজুমদার এখনো তরুণ থিয়েটার কর্মীদের প্রধান আশ্রয়স্থল। যেকোনো সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে গেলে তিনি সাধ্যমতো সমাধানের চেষ্টা করেন। থিয়েটারের নান্দনিকতার বাইরেও তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা অসাধারণ। তিনি সব সময় তরুণদের শিখিয়েছেন যে সাংগঠনিকভাবে শক্ত না হলে কোনো কাজ টেকসই হয় না। থিয়েটার দল, থিয়েটার পত্রিকা, থিয়েটার স্কুল পরিচালনা এবং আইটিআইয়ের কাজে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে কুররাতুল-আইন-তাহমিনা দীর্ঘদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকে তিনি ‘খালু’ হলেও তাঁকে ‘কাকা’ বলে ডাকেন। কারণ, তাঁর খালা ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই তাদের বাসায় রামেন্দু মজুমদারের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তখন থেকেই তিনি ‘কাকা’ বলে ডাকতেন। পরে সম্পর্ক বদলালেও সেই ডাকটি অপরিবর্তিত ছিল।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, রামেন্দু মজুমদারের জন্মদিনের কথা ভেবে সারা দিন তিনি ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের নেতৃত্ব, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে নিমগ্ন ছিলেন। তিনি বলেন, শহীদ মুনীর চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, ত্রপা মজুমদারসহ এই পরিবারের ভূমিকা আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ ঐতিহ্যের ধারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমরা যেন সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছি। বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। বারবার আন্দোলন, লড়াই ও আত্মদান করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে উত্তরণ ঘটছে না—এই প্রশ্নও তিনি রাখেন।

সবশেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মনে হচ্ছে জীবনটা কত মূল্যবান। অনেক সময় অপচয় করেছেন। বাঁচার ইচ্ছা মানুষের শেষ হয় না, কিন্তু জীবন শেষ হয়—এটিই চূড়ান্ত সত্য। তাই প্রতিটি দিন যেন অর্থবহ কাজে ও মানুষের কল্যাণে লাগে। তিনি তাঁর মা-বাবাকে স্মরণ করেন এবং বাবার উদারনৈতিক চরিত্র কীভাবে তাঁর হৃদয়কে প্রসারিত করেছে তা তুলে ধরেন। স্ত্রী ও কন্যার কথা বলতে গিয়ে নিজের পরিতৃপ্তি ও গর্ব প্রকাশ করেন। জীবনের পথে যাঁদের সাহচর্য, সহায়তা, স্নেহ, প্রেরণা ও বন্ধুত্ব পেয়েছেন তাঁদের দীর্ঘ তালিকা স্মরণ করেন তিনি। সবশেষে তিনি তাঁর স্বপ্নের সমাজের কথা বলেন—একটি সহনশীল, উদার, ঘৃণা ও বিদ্বেষমুক্ত মানবিক সমাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’ এই লাইনটি উচ্চারণ করে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ছায়া কর্মকারের কণ্ঠে ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও দাও প্রাণ’ গানটির মাধ্যমে।