ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষণ শুরু হয়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে রামপুর জেলায় অবস্থিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা, এবং স্থানীয় লোকজন প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ক্যাম্পাসে চাটাই বিছিয়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে বসেছেন। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে দিল্লির পথে যে আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, সেই সারা দেশের প্রেক্ষাপটেই এই সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে নামকরণ করা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সালে প্রখ্যাত মুলিম রাজনীতিক আজম খান প্রতিষ্ঠা করেন। গত ১৫ জুলাই রামপুর জেলা প্রশাসন এক আদেশ জারি করে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি স্থাপনার মধ্যে প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজসহ মাত্র দুটি ভবন ছাড়া বাকি সবই অনুমোদন বিধি লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশিকার তোয়াক্কা না করেই এসব নির্মাণ করা হয়েছে। এ অভিযোগে ৫ আগস্টের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিজ খরচে এ ভবনগুলো সরিয়ে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে, না মানলে প্রশাসন নিজেই বুলডোজার নিয়ে নেমে ভাঙবে এবং খরচ আদায় করবে।

তবে গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন এই আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ আরোপ করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন আল-জাজিরার কাছে পরিষ্কার করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে ভবন ভাঙার নিধান্তমূলক নির্দেশ বাতিল হয়েছে। বরং এই সময়সীমার মধ্যে কোনো ভাঙা ভাঙা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্থায়ীভাবে এ আদেশ বাতিলের জন্য আইনি লড়াইয়ে নেমেছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও চ্যান্সেলর আজম খান সমাজবাদী পার্টির (এসপি) শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং রাজ্য শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কট্টর সমালোচক। আইনপ্রণেতা জাভেদ আলী খানের মতে, ভাঙার এই সিদ্ধান্ত প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়। এর পেছনে চারটি কারণ দেখেন তিনি—এটা আজম খানের প্রতিষ্ঠান, ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলেন মুলায়ম সিং যাদব, উদ্বোধন করেছিলেন অখিলেশ যাদব, এবং এটি একটি সংখ্য লঘু প্রতিষ্ঠান। যদিও বিজেপি মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী দাবি করেছেন, এটা নেহাতই ‘বেআইনি দখল’ সরানোর আইনি প্রক্রিয়া এবং সমাজবাদী পার্টির তোষণ রাজনীতির উধাহারণ।

২৫০ একর জমিতে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী রয়েছেন। বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন, দিল্লির পথে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের ফলে যখন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ সম্ভব, তখন শিক্ষার্থীদের এই গণআন্দোলন কেন প্রশাসনকে ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, যেসব জায়গায় ভবন নির্মিত, সেখানে নির্মাণকালে রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) কোনো এখতিয়ার ছিল না। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা আরডিএর আওতায় আসে।

অন্যদিকে, এটি শুধু মুলিম অধ্যুষিতি একটি প্রতিষ্ঠান নয়। শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশই হিন্দু। প্যারামেডিক্যালের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর জানান, এত দিন এখানে কখনো নিজেকে অমুসলিম মনে হয়নি। কিন্তু নারী শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ এখানে কারণ তাদের পরিবার এখানকার পরিবেশকে নিরাপদ মনে করত। শিক্ষার্নী ইকরা বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে গেলে গ্রামের মেয়েদের পরিবার অন্য কোথাও পড়তে দিতে রাজি হবে না। দিল্ল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বর্ানন্দের মতে, এই ভাঙা শুধু নিয়মনীতি নয়, বরং সংখ্যাদলঘু প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে এবং হিন্দু-মুসলিমের মেশামেশি রোধ করার এক সুকৌশলী রণনীতি।

ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পুলিশ গিয়ে অভিবিভাবকদের চাপ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তদুতারি সংক্রান্ত যে কর্মকর্তার রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডি ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী স্পষ্ট করেছেন, আইনে নিয়ম লংঘনে নির্মিত ভবনের একমাত্র সমাধান সেগুলো ধ্বংস করা। কিন্তু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা পিছু হটার কথা অস্বীকার করছেন। সমাজবাদী পার্টির একাধিক বিধায়ক ও এমপিরও আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন।