ব্রাজিলের জার্সিতে ২০১৪ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার স্বপ্নপূরণের সেই প্রস্তুতিশিবিরেই পোকার নামক মানসিক কৌশলের খেলাটির প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মেছিল নেইমারের। সতীর্থদের সঙ্গে তাসের লড়াইয়ে মেতে ওঠার সেই সূচনা থেকে এক দশক পেরিয়ে এখন পোকারই তার কঠিন সময়ের অন্যতম মানসিক ভরসা।
মর্যাদাপূর্ণ ওয়ার্ল্ড সিরিজ অব পোকারের (ডব্লিউএসওপি) সর্বশেষ আসরে লাস ভেগাসে অংশ নিলেও পুরস্কার জয়ের আগেই সেখান থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। দাবার মতোই আন্তর্জাতিক মাইন্ড স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএসএ) পোকারকে ‘মাইন্ড স্পোর্টস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় বিষয়টি নেইমারের জন্যও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। বিগত বারো বছরে তিনি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় পোকার সার্কিট ব্রাজিলিয়ান সিরিজ অব পোকার (বিএসওপি), ডব্লিউএসওপি এবং স্পেনের বার্সেলোনায় ইউরোপিয়ান পোকার ট্যুর (ইপিটি)-এ নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন। এক পর্যায়ে অনলাইন পোকার প্ল্যাটফর্ম পোকারস্টার্সের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও কাজ করেছেন এই তারকা।
নথিভুক্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলে তিনি ২৪ লাখ ব্রাজিলিয়ান রিয়াল মূল্যের পুরস্কার জিতেছেন, যার বিনিময় মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৫ কোটি ৮২ লাখেরও বেশি। ফুটবলের পেশাদার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি পোকারের প্রতি তার আকর্ষণ ক্রমশ গভীর হয়েছে। ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের কয়েক মাস পরই প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান পোকার ট্যুরে অংশ নেন নেইমার, সঙ্গে ছিলেন তখনকার সতীর্থ জেরার্ড পিকে। সেই সফর থেকেই পোকারস্টার্সের সাথে তার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।
২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ব্রাজিলের হৃদয়বিদারক হারের পর ছুটিতেও তিনি ডব্লিউএসওপিতে খেলতে যান। এমনকি অনেক সময় অনলাইন টুর্নামেন্টের কারণে পরিবারকে সময় দিতে না পারার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাঁ হাঁটুর এসিএল ইনজুরি পাওয়ার পর দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় পোকার আরও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়ে ওঠে। সে সময় অন্তত ২০টি প্রকাশ্য আসরে তিনি অংশ নিয়েছেন বলে জানা যায়।
বিএসওপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাফায়েল মোরায়েস, যিনি নিজেও অনলাইন পোকারে ১০ লাখ ডলারের ওপর জেতা প্রথম ব্রাজিলিয়ানদের একজন, তার মতে নেইমারের পোকারপ্রেম নিছক কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্কের গন্ডিতে আটকে নেই। মোরায়েসের মতে, ‘বিশ বছরের বেশি সময় ধরে টুর্নামেন্ট খেলছি, কিন্তু নেইমারের মতো জেতার অদম্য ইচ্ছা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছি। সে বুঝেছে যে পোকার এমন একটি খেলা যেখানে পড়াশোনা, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা দিয়ে উন্নতি ঘটানো যায়। ফুটবল তার প্রথম ভালোবাসা, আর পোকার হলো দ্বিতীয়।’
প্রতি মৌসুমে ২০ থেকে ৩০ হাজার প্রতিযোগী অংশ নেওয়া বিএসওপির ২০২৫ আসরের মোট পুরস্কারমূল্য ছিল ১৩ কোটি ৪০ লাখ রিয়াল, যা কোপা দো ব্রাজিল ও ব্রাজিলিয়ান লিগের পর দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম পুরস্কারের আসর। পেশাদার খেলোয়াড়দের মতো মাসে শত শত টুর্নামেন্ট না খেলেও নেইমার কৌশলে নিজেকে প্রস্তুত করেন। খেলার পর নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্ত খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করেন, মোরায়েস ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আন্দ্রে আকারির সাথে বিভিন্ন হাত নিয়ে আলোচনা করেন এবং টেবিলে নিজের অবস্থান, চিপের পরিমাণ ও প্রতিপক্ষের কৌশল গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা চালান। এই মৌসুমে নথিভুক্ত টুর্নামেন্টগুলোতে তিনি তিন লাখ রিয়ালের বেশি পুরস্কার জিতেছেন এবং কয়েকটি বড় আসরের ফাইনাল টেবিলেও জায়গা করে নিয়েছেন।
মোরায়েস মনে করেন, পরিসংখ্যান নয়, বরং নেইমারের মূল শক্তি তার মানসিক দৃঢ়তা। তিনি বলেন, ‘মাঠে যেমন আক্রমণাত্মক, পোকারের টেবিলেও তেমনি। সাহসীভাবে ব্লাফ দিতে পারে, আবার তাকে ব্লাফ করাও কঠিন। চাপের মুহূর্তে সে আরও উজ্জ্বল হয়, অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি নেওয়ার পরিস্থিতির মতো যেখানে ভয় পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই।’ নেইমারকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ আমন্ত্রণমূলক প্রতিযোগিতা ‘বিএসওপি ওয়ান নেইমার জুনিয়র’-ও চালু করেছেন আয়োজকেরা।
কৈশোর থেকেই তুমুল জনপ্রিয়তার বেড়াজালে থাকা ফুটবল তারকার জন্য পোকারের বড় আকর্ষণ হলো এখানে তিনি অনেকটাই সাধারণ জীবন যাপন করতে পারেন। মোরায়েসের কথায়, ‘পোকারই একমাত্র জায়গা যেখানে তাকে সবচেয়ে কম ছবি তুলতে বলা হয়। অন্যসব জায়গায় সে একটি বড় ঘটনা, কিন্তু পোকার টেবিলে সে আর দশজনের মতো একজন সাধারণ খেলোয়াড়। বন্ধু ও পরিবারের সাথে ব্যক্তিগত টুর্নামেন্টেও মেতে উঠতে পারে সে। এ কারণেই খেলাটা তার এত প্রিয়।’
তবে পোকারের প্রতি এই আকর্ষণ সবসময় প্রশংসিত হয়নি। সম্প্রতি একাধিকবার সমালোচিত হতে হয়েছে তাকে। গত বছর সান্তোসের এক ম্যাচ চলাকালে ভিলা বেলমিরোর ভিআইপি বক্সে বসে অনলাইনে পোকার খেলতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। কিছুদিন আগে সাও পাওলোতে বিএসওপি উইন্টার টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন, যখন তার ক্লাব সান্তোস কোপা সুদামেরিকানার প্লে-অফ খেলছিল। তবে ক্লাবের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ম্যাচের দলে তিনি ছিলেন না এবং সকালের অনুশীলন সেরেই টুর্নামেন্টে যোগ দিয়েছিলেন। সান্তোস আরও স্পষ্ট করে জানায়, যে খেলোয়াড়েরা ম্যাচের দলে থাকেন না বা ছুটিতে থাকেন, তারা নিজেদের সময় ব্যয় করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

