বুধবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট যতই জটিল হোক না কেন, বাংলাদেশকে আর কখনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’-এ পরিণত হতে দেওয়া হবে না। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হিসেবে তিনি এটিকে চিহ্নিত করেন। খলিলুর রহমানের মতে, সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবার আগে অগ্রাধিকার হবে দেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা সেই ক্লায়েন্ট স্টেটের পর্যায়ে কখনো ফিরে যাব না।’

অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের সাহস ও দেশপ্রেম চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আহতদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি দেশের সাবেক অবস্থার কথা স্মরণ করে বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায় পার করেছিল, যখন ছোট ছোট শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সেই ভয়াবহ সময়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।

খলিলুর রহমান জানান, সেসময় তিনি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তরে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তার ধারণা, এই যোগাযোগের পরই কিছু বাহিনীর গুলিবর্ষণ বন্ধ হয় এবং পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন: প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্পন্ন করা। তার দাবি, তিনটি কাজই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচনকে তারা উৎসবমুখর ও সফল হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু এখন সেই দেশ ফিরে আসছে, যা তাদের অত্যন্ত আনন্দিত করেছে। খলিলুর রহমান বলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য জুলাই আন্দোলনের বার্তারই প্রতিধ্বনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বিশ্ব এখন একটি জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট। এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশকে পথ চলতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পুনরায় চালুর বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিষয়টি জানালে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার নির্দেশ দেন। খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন যে এটি একটি ‘ইম্পসিবল মিশন’, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জবাব দেন, ‘ইম্পসিবল মিশনের জন্যই তো ফরেন অফিস (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)।’ এই সাফল্যকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে জুলাইয়ের শহীদরা দেশের কূটনীতিকদের ওপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, তা পালনের সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানের প্রথম দিনের স্মৃতি চারণ করে খলিলুর রহমান বলেন, তিনি প্রথমে হাসপাতালে গিয়ে জুলাইয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ফিরে এসে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমরা যেন কখনো না ভুলে যাই যে আমরা কী অবস্থায় তাদের রক্তের ওপর হেঁটে এসে এখানে বসেছি।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ছেলেমেয়েরা ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশকে ছিনিয়ে এনে তাদের হাতে দিয়েছে। এখন তাদের দায়িত্ব হলো ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই দেশকে আগলে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, জুলাইয়ের যে দায়, সেই দায়িত্ব কেউ যেন ভুলে না যান এবং প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখেন যে শহীদরা তাদের হাতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন।