ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় খাবার শেষে একজন গ্রাহক নিজের মুঠোফোন থেকে ব্যাংকের কিউআর স্ক্যান করলেন, যদিও তাঁর অ্যাপ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের। কয়েক মাস আগেও এ ধরনের লেনদেন প্রায় অসম্ভব ছিল। বর্তমানে তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতাকে একীভূত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে বাংলা কিউআর। ফলে গ্রাহক নিজের পছন্দের অ্যাপ ব্যবহার করেই যেকোনো বাংলা কিউআর দিয়ে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এই পরিবর্তনটি ছোট মনে হলেও অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় একটি মৌলিক রূপান্তরের সূচনা।

বাংলা কিউআরকে কেবল একটি নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একটি আন্তঃসংযুক্ত পেমেন্ট অবকাঠামো, যেখানে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানও একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহককে সেবা দেয়। বিশ্বের সফল ডিজিটাল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি থেকে আসে না, বরং এমন উন্মুক্ত অবকাঠামো থেকে আসে, যেখানে সবাই একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবার মান বাড়ায়। এ কারণে বাংলা কিউআর একটি জাতীয় অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। যেমন মহাসড়ক শুধু যানবাহনের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির গতি বাড়ানোর জন্য নির্মিত হয়, তেমনি একটি সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা শুধু অর্থ পরিশোধ সহজ করে না, এটি বাণিজ্য, উৎপাদনশীলতা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং কর ব্যবস্থার দক্ষতাও বাড়ায়। নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমে, লেনদেন স্বচ্ছ হয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ডিজিটাল ইতিহাস তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার পথ সহজ করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে উপযুক্ত নীতি ও অবকাঠামো পেলে মানুষ নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তার, মহামারির সময় ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি সহায়তা বিতরণ এবং অনলাইন আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ তারই নিদর্শন। তাই বাংলা কিউআরের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে: একটি আধুনিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই কি একটি দেশ নগদ টাকা নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে? অভিজ্ঞতা বলে, পারে না। ভারতের ইউপিআই, সিঙ্গাপুরের এসজিকিউআর কিংবা কেনিয়ার এম-পেসা শুধু উন্নত প্রযুক্তির কারণে সফল হয়নি; তারা এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে যেখানে ভোক্তা, ব্যবসায়ী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সবার জন্যই ডিজিটাল লেনদেন সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল।

বাংলা কিউআর বাংলাদেশের সামনে আজ সেই সুযোগ নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো নীতি ও অবকাঠামো। ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার দ্রুত হলেও বাস্তবতা হলো, দৈনন্দিন অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর। এর কারণ প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, অর্থনীতির কাঠামো। দেশের অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানি, রিকশার মালিক কিংবা কারিগরসহ অধিকাংশের আয় নগদে আসে। সেই নগদ দিয়েই তাঁরা পাইকারকে পরিশোধ করেন, শ্রমিকের মজুরি দেন এবং সংসারের ব্যয় চালান।

অনেকে মনে করেন, মানুষ কিউআর ব্যবহার করছেন না কারণ তাঁরা প্রযুক্তি বোঝেন না। বাস্তবতা ভিন্ন। একজন মানুষ তখনই কিউআর ব্যবহার করবেন, যখন তাঁর অর্থ আগে থেকেই ব্যাংক হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকে। একটি মৌলিক সত্য হলো, কিউআর নতুন অর্থ সৃষ্টি করে না; এটি শুধু বিদ্যমান ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তর করে। অর্থাৎ নগদ অর্থ সহজে ব্যাংকে বা ওয়ালেটে জমা দেওয়ার সুযোগ না থাকলে কিউআরের ব্যবহারও সীমিত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, কুষ্টিয়ার একজন কৃষক সকালে ১২ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করলেন। যদি বাজারের পাশেই তিনি সেই অর্থ সহজে ব্যাংকে জমা দিতে পারেন, তাহলে বিকেলে সার বা বীজ কেনার সময় বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু যদি টাকা জমা দিতে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের কোনো শাখায় যেতে হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই নগদ নিজের কাছেই রাখবেন। ফলে কিউআর স্টিকার থাকলেও সেটি ব্যবহার হবে না। অর্থাৎ সমস্যা প্রযুক্তির নয়, নগদ টাকা ব্যাংকে ঢুকানো বা ব্যাংক থেকে বের করার অবাধ সুযোগের।

কেনিয়ার এমপেসার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর বিস্তৃত ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে বিকাশ বা নগদের সাফল্যের কারণও সেটাই। মানুষ গ্রামের কাছেই নগদ জমা দিতে এবং প্রয়োজন হলে তুলতে পারতেন। তাই ডিজিটাল অর্থ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলা কিউআরের জন্য একই শিক্ষা প্রযোজ্য। প্রশ্নটি কেবল কতগুলো কিউআর স্টিকার বিতরণ হয়েছে তা নয়; আসল প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ মানুষ কত সহজে তাঁর নগদ অর্থকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে আনতে পারছেন। ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আসলে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট, পেমেন্ট অ্যাপ নয়। মানুষ এমন একটি নেটওয়ার্ক চায় যার মাধ্যমে সহজে টাকা জমা দেওয়া এবং তোলা যায়। একে বলা যায় ব্যাংকিং অ্যাক্সেস পয়েন্ট।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকানে বাংলা কিউআর আছে। কিন্তু দিনের শেষে তিনি যদি সহজে বিক্রির অর্থ ব্যাংকে জমা দিতে না পারেন, কিংবা পরদিন প্রয়োজন মতো তুলতে না পারেন, তাহলে তিনি খুব দ্রুতই নগদ লেনদেনে ফিরে যাবেন। কারণ ব্যবসায় প্রযুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারল্য। এই কারণে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট কেবল একটি ব্যাংকিং সেবা নয়; এটি পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির তারল্য অবকাঠামো। বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, হাট ও বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নগদ লেনদেন হয়। শুধু ব্যাংক শাখার মাধ্যমে এই অর্থপ্রবাহকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন শাখার বাইরে বিস্তৃত ব্যাংকিং প্রবেশদ্বার (অ্যাক্সেস পয়েন্টস)।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির মাধ্যমে অনুমোদিত এজেন্ট, মার্চেন্ট বা অন্যান্য সেবা কেন্দ্রকে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট পরিচালনার সুযোগ দেয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের ব্যাংকিং মানচিত্র বদলে যেতে পারে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু হিসাব খুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি তখনই ঘটে, যখন মানুষ সহজে হিসাব ব্যবহার করতে পারে। অর্থনৈতিক প্রণোদনা ছাড়া ইকোসিস্টেম টেকে না। একটি সফল পেমেন্ট ব্যবস্থার তিনটি অংশীজন রয়েছে: ভোক্তা, ব্যবসায়ী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এদের যেকোনো একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই টেকসই হয় না।

একজন ব্যবসায়ীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলে তাঁর লাভ কী? যদি লেনদেন ব্যয় বেড়ে যায়, অর্থ পেতে দেরি হয় বা প্রযুক্তিগত সমস্যায় ব্যবসা ব্যাহত হয়, তাহলে তিনি নগদেই ফিরে যাবেন। তাই মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন। আবার সব ব্যবসার লাভের হার এক নয়। একটি মুদিদোকানের মার্জিন যেখানে ১-২ শতাংশ, সেখানে একটি রেস্তোরাঁ বা হাসপাতালের মার্জিন অনেক বেশি। তাই সব খাতের জন্য একই এমডিআর সব সময় কার্যকর না-ও হতে পারে। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নমনীয় কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শুধু এমডিআর নয়, দ্রুত সেটেলমেন্ট, নির্ভরযোগ্য গ্রাহকসেবা এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীরা প্রযুক্তির চেয়ে নিশ্চয়তাকে বেশি মূল্য দেন। একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও অর্থনীতি রয়েছে। একজন মার্চেন্টকে নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে হিসাব খোলা, পরিচয় যাচাই, কিউআর সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য পাঁচটি নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা যেতে পারে। প্রথমত, ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যত বেশি মানুষ সহজে টাকা জমা ও তুলতে পারবেন, বাংলা কিউআরের ব্যবহারও তত বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সম্পূর্ণ ডিজিটাল হিসাব খোলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ই-কেওয়াইসি, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই এবং বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই হিসাব খোলার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, এমডিআর ও আইআরএফ কাঠামো বাস্তবমুখী করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সক্ষমতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, উভয় বিষয় বিবেচনায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। চতুর্থত, ডিজিটাল পেমেন্টে আস্থা বৃদ্ধি করতে হবে। দ্রুত সেটেলমেন্ট, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, কার্যকর গ্রাহকসেবা এবং স্বচ্ছ বিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া কোনো পেমেন্ট ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পঞ্চমত, বাংলা কিউআরকে একটি জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে ব্যাংক–সক্ষম ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট কেন্দ্র এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম একটি ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাক্সেস পয়েন্টের মতো পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সুযোগ এসেছে। বাংলা কিউআর সেই ভিত্তি তৈরি করেছে যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কম নগদনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। তবে কিউআর স্টিকার বিতরণই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দেশের একজন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক কিংবা গৃহিণী কত সহজে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে, তুলতে এবং একই হিসাব ব্যবহার করে প্রতিদিনের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন তার ওপর। যদি প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রবেশাধিকার, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং আস্থার এই তিন ভিত্তি শক্তিশালী করা যায়, তাহলে বাংলা কিউআর কেবল একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা হয়ে থাকবে না; এটি হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যা ক্যাশলেস, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে দেশের যাত্রাকে নতুন গতি দেবে।