ক্রীড়াজগতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যারা নিজেদের সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরকালীন আইকনে পরিণত হন। তেমনই একজন আর্জেন্টাইন টেনিস তারকা গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি, যিনি শুধু তার খেলার দক্ষতার জন্যই নয়, বরং ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্যও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বিশ্ব টেনিসে সাবাতিনির অবস্থান ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অসাধারণ ব্যাকহ্যান্ড, দ্রুতগতির গ্রাউন্ডস্ট্রোক এবং নিখুঁত কোর্ট কাভারেজ তাকে প্রতিপক্ষের জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছিল। ১৯৯০ সালে ইউএস ওপেন জিতে তিনি ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেন। এর আগে ১৯৮৮ সালের সিউল অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার পতাকাবাহকের দায়িত্ব পালন করে একক ইভেন্টে রৌপ্য পদকও জিতেছিলেন তিনি।
জার্মান তারকা স্টেফি গ্রাফের সাথে সাবাতিনির প্রতিদ্বন্দ্বিতা টেনিস ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। পাশাপাশি এই দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৮৮ সালে তারা একত্রে উইম্বলডনের নারী ডাবলস শিরোপা জিতেছিলেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সাবাতিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ব ক্রীড়ার পপ-কালচার আইকন। ১৯৮৯ সালে জার্মান প্রতিষ্ঠান মুলহেনসের সাথে অংশীদারত্বে তার নামে সিগনেচার পারফিউম বাজারে আসে, যা বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে সেই ব্র্যান্ড পোশাক, ঘড়ি ও হোম লাইফস্টাইল পণ্যেও সম্প্রসারিত হয়।
১৯৯২ সালে প্রথম কোনো নারী টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে তার নামে একটি গোলাপের জাতের নামকরণ করা হয়। দুই বছর পর গ্রেট আমেরিকান ডল কোম্পানি তার আদলে বিশেষ পুতুল তৈরি করে। একই বছরে প্রকাশিত হয় তার আত্মপ্রেরণামূলক গ্রন্থ ‘মাই স্টোরি’। কোর্টের বাইরেও সাবাতিনির অবদান অসামান্য। ইউনিসেফ, ইউনেসকো ও স্পেশাল অলিম্পিকসের বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে তিনি যুক্ত হন। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের কল্যাণে নিয়মিত কাজ করেন তিনি।
২০১৯ সালে এই মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশন তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ফিলিপ শাত্রিয়ে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এর আগে ২০১৭ সালে তিনি ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা ও সমাজসেবার জন্য জ্যাঁ বোরোত্রা স্পোর্টসম্যানশিপ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। বর্তমানে তিনি বুয়েনস আইরেস ও সুইজারল্যান্ডে সময় কাটান। সাইক্লিং ও দৌড়ের মতো সক্রিয় জীবনযাপন তার নিত্যসঙ্গী। ২০১৪ সালে বুয়েনস আইরেসে ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি ও গিলার্মো ভিলাসের মতো কিংবদন্তিদের পাশে তার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।
সাবাতিনি এখনও ফরাসি ওপেনের লিজেন্ডস ম্যাচে অংশ নেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোটিভেশনাল বক্তা হিসেবে খ্যাতির চাপ, মানসিক দৃঢ়তা ও জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি একটি প্রজন্মের কাছে শুধু টেনিস খেলোয়াড় নন, বরং একটি সময়ের প্রতীক হয়ে আছেন।




