হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি নির্মাতা, অভিনেতা ও প্রযোজক গুরু দত্ত। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অকালমৃত্যু হলেও চলচ্চিত্র জগতে তার অবদান চিরস্মরণীয়। তার জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনায় উঠে এসেছে ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েন। ১৯৬৪ সালে অক্টোবরে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ ও মদের প্রভাবে তার মৃত্যু ঘটে, যা দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা তা আজও স্পষ্ট নয়। এই ঘটনা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে স্তব্ধ করে দেয় এবং সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হন তার স্ত্রী গীতা দত্ত।
গীতা দত্ত (জন্মনাম গীতা রায়) পঞ্চাশের দশকের শুরুতে একজন শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তার কণ্ঠের সুরে মাতোয়ারা ছিল শ্রোতারা। এক চলচ্চিত্রের কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হয় গুরু দত্তের সঙ্গে। কাজের সূত্রে আলাপ, তারপর প্রেম। দুই পরিবারের নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে বিবাহ হয় তাদের। বিয়ের পরপরই গুরু দত্তর ক্যারিয়ার তুঙ্গে ওঠে, অন্যদিকে গীতা দত্তর কেরিয়ারে ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে। নতুন গায়িকাদের আগমন, পরিবর্তিত সংগীতধারা এবং পারিবারিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে তার কাজ কমতে থাকে। যে সম্পর্কে গীতা একসময় বেশি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সেখানে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলে যায়।
বিয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই গুরু দত্তর সিনেমায় নিয়মিত দেখা যেতে থাকে তরুণ অভিনেত্রী ওয়াহিদা রেহমানকে। 'সিআইডি', 'পিয়াসা', 'কাগজ কে ফুল' ও 'চৌদহভি কা চাঁদ'-এর মতো সিনেমায় তাদের জুটি দর্শকদের মুগ্ধ করে। খুব দ্রুত চলচ্চিত্রমহলে তাদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কখনোই প্রকাশ্যে সম্পর্কের কথা স্বীকার করা হয়নি, but গুঞ্জন থামেনি। বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিস্থিতি গীতা দত্তকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। এমনকি একসময় গীতা দত্ত স্বামীর আনুগত্য যাচাই করতে একটি ভুয়া প্রেমপত্রের আশ্রয় নেন বলে জানা যায়। ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবরার আলভির স্মৃতিচারণায় দাবি করা হয়েছে, এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গুরু দত্ত রাগের মাথায় স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছিলেন। তবে এই ঘটনা বিতর্কিত, কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো সমসাময়িক প্রমাণ নেই।
সম্পর্কে নতুন করে প্রাণ ফেরানোর চেষ্টায় বাংলা ভাষায় 'গৌরী' নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেন গুরু দত্ত। নায়িকা হিসেবে বেছে নেন গীতা দত্তকে। কিন্তু শুটিং শুরুর পরই তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। একদিন মেকআপ ও প্রস্তুতি নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। ওয়াহিদা রেহমানের প্রসঙ্গ টেনে গীতা দত্ত প্রশ্ন করেন, 'তুমি কি চাও, আমি ওয়াহিদার চেয়েও খারাপ দেখাই?' এরপর শুটিং বন্ধ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ছবিটি আর সম্পূর্ণ হয়নি। এ সময় থেকেই দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর দূরত্ব তৈরি হয়।
গুরু দত্ত অন্তর্মুখী, সংবেদনশীল ও কাজপাগল মানুষ ছিলেন। তিনি দিনের পর দিন শুটিং, সম্পাদনা ও চিত্রনাট্য নিয়ে ডুবে থাকতেন। সামাজিক আড্ডা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে তার অনাগ্রহ ছিল স্পষ্ট। অন্যদিকে গীতা দত্ত ছিলেন প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল ও সামাজিক। এই স্বভাবগত পার্থক্যও তাদের দূরত্ব বাড়িয়েছিল। বাহ্যিকভাবে সব ঠিক থাকলেও ভেতরে ক্রমেই জমছিল দূরত্ব।
গুরু দত্তর মৃত্যুর পর গীতা দত্ত দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কাজে ফিরতে চাইলেও আগের মতো নিজেকে খুঁজে পাননি। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে লিভারের জটিলতা বেড়ে যায়। অবশেষে ১৯৭২ সালে, মাত্র ৪১ বছর বয়সে, তার মৃত্যু হয়। আট বছরের ব্যবধানে ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র হারায় এক অসাধারণ শিল্পী দম্পতিকে।
ওয়াহিদা রেহমান আজীবন এই প্রসঙ্গে সংযত ছিলেন। তিনি গুরু দত্তকে কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন। গুরু দত্ত–ওয়াহিদা রেহমানের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।




