আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট টোমোকো আকানে (জাপান) এবং জ্যেষ্ঠ ট্রায়াল লয়ার আবদুলাই সিয়ে (সেনেগাল)-এর বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, আইসিসি এমন সব কর্মকর্তাদের বিচার করার চেষ্টা করছে যাদের সরকার আদালতের এই এখতিয়ার মেনে নেয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক আদালতটিকে পুরোপুরি 'বিনাশ' করার প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আইসিসি-কে একটি 'দুর্নীতিগ্রস্ত এবং মারাত্মকভাবে রাজনৈতিক আদালত' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, এই আদালতটি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং নির্ধারিত ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে কাজ করছে, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ। তবে এই বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে আইসিসি-র প্রধান প্রসিকিউটর এবং নয়জন বিচারকসহ অন্তত ১১ জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর পরিষেবা গ্রহণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মূলত আফগানিস্তানে মার্কিন কর্মীদের নিয়ে আইসিসির তদন্ত এবং গাজা যুদ্ধের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রতিশোধ হিসেবেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—কোনোটিই আইসিসি-র সদস্য দেশ নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদ থেকেই আইসিসি-র তীব্র বিরোধী। তিনি একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'হুমকি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই আদালতের কোনো বৈধতা বা কর্তৃত্ব নেই। গত মাসে মার্কো রুবিও আইসিসি-র ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রকে আদালত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে কারা এই আহ্বানের কথা শুনছে আর কারা শুনছে না।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রাখে, অথবা রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে কোনো ঘটনার তদন্ত করতে পারে। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা মনে করে, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের দায়মুক্ত রাখার পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট এবং আরও দুটি মানবাধিকার সংস্থা নিউইয়র্কে মামলা করে জানিয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো তাদের আইসিসি-র সাথে কাজ করে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

পাশাপাশি, কানাডা, উগান্ডা এবং বেনিনের তিনজন বিচারকও নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন। তাদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো বেআইনি এবং বিচারকদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট' (IEEPA)-এর অধীনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইনত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাধারণ আর্থিক লেনদেন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ মার্কিন ডলার বা মার্কিন ব্যাংকের সাথে যুক্ত যেকোনো প্রতিষ্ঠান এই বিধিনিষেধ মেনে চলতে বাধ্য থাকে।

মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসি-র প্রতি আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে। জুলাই মাসে এক ভিডিও বার্তায় রুবিও অভিযোগ করেন যে, তথাকথিত আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আদালত মনে করে তারা মার্কিন সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিতে পারবে, তবে তারা মার্কিন সংকল্পের পূর্ণ অর্থ বুঝতে পারবে।