বাংলা কাব্যসাহিত্যে কিছু কবি আছেন, যাঁদের রচনা শুধু নান্দনিক বিচারের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। সময়, রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের বাস্তব সংগ্রামের দলিল হয়ে ওঠে তাঁদের কবিতা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) এমনই এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। তিনি মূলত গণমানুষের কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের চিত্র যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে প্রেম, প্রকৃতি, বার্ধক্য, মৃত্যু ও আত্মসমালোচনার গভীর অনুভব। আধুনিক বাংলা কবিতাকে অভিজাত গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার কৃতিত্ব অনেকাংশেই তাঁর। কৃত্রিম শৈল্পিকতার বদলে জীবনের খাঁটি রূপ, লৌকিকতার চেয়ে মানবিকতা এবং আড়ষ্ট ভাষার পরিবর্তে মানুষের মুখের সহজ কথাই তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তাঁর লেখা একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবিক, প্রতিবাদী ও কোমল, বাস্তবসংলগ্ন ও অন্তর্মুখী। শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বৈষম্য ও দুর্দশার বিরুদ্ধে তীব্র দ্রোহ ছিল তাঁর কাব্যের মূল সুর।

১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে তাঁর জন্ম। পরবর্তীকালে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেও, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ছাত্রজীবনেই সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর রাজনৈতিক চেতনা সুসংহত রূপ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদের উত্থান ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম—এই সবকিছু খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। যখন বাংলা কবিতা মূলত রূপ-রস-ছন্দের মায়ায় নিমগ্ন, তখন সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাব্যদর্শন সামনে আনেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০) বাংলা কবিতায় নতুন যুগের সূত্রপাত ঘটায়। রবীন্দ্র-উত্তর আবেগ ও জীবনানন্দীয় নিঃসঙ্গতার বিপরীতে তিনি নিয়ে আসেন সংগ্রামের ভাষা। গ্রন্থের নামই প্রতীকী—তিনি সেনাপতি নন, বরং সামনের সারির সাধারণ সৈনিক। ‘পদাতিক’-এর প্রথম কবিতায় তিনি ঘোষণা দেন: ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য / ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা, চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য, / কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’ এই পংক্তিগুলো স্পষ্ট করে যে তিনি সুন্দরের উপাসক হয়েও তা অর্জনের জন্য লড়াইয়ের ময়দানকেই বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৪০ থেকে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে প্রকাশিত ‘চিরকুট’ (১৯৪৬) ও ‘অগ্নিকোণ’ (১৯৪৮)-এর কবিতাগুলোতে তীব্র ক্ষোভ, বুর্জোয়া সমাজের প্রতি বিদ্রূপ এবং মেহনতি মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ লক্ষণীয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিসত্তা ও রাজনৈতিক সত্তা ছিল অবিচ্ছেদ্য। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৪২ সালে সর্বক্ষণের কর্মী হন। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করলেও ১৯৪৮ সালে পার্টি নিষিদ্ধ হলে অন্যান্য কর্মীদের মতো তিনিও কারাবরণ করেন। দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘটে সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯৫০ সালের নভেম্বরে মুক্তি পেলেও তীব্র আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হন। মাত্র ৭৫ টাকা বেতনে একটি প্রকাশনা সংস্থায় সাব-এডিটরের কাজ নেন, কিন্তু অচিরেই ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে লেখক গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরের বছর স্ত্রীকে নিয়ে বজবজের একটি শ্রমিক বস্তির মাটির ঘরে বসবাস শুরু করেন এবং চটকলশ্রমিকদের সংগঠিত করার আন্দোলনে সরাসরি কাঁধ মেলান। কলকাতা বন্দরাঞ্চলেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর দর্শন ছিল খাঁটি মার্ক্সবাদী সাম্যবাদ; বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই সাধারণ মানুষের মুক্তি আনতে পারে। এই দৃঢ়তা কবিতায় প্রতিফলিত: ‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না? কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে।’ তিনি কেবল তাত্ত্বিক নন, চটকলশ্রমিক, ট্রামকর্মী ও কৃষকদের সঙ্গে মিশে তাঁদের কষ্ট ও দীর্ঘশ্বাস নিজের বুকে ধারণ করেছিলেন।

তবে ষাটের দশকের পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভাঙন ও জরুরি অবস্থার রাজনৈতিক জটিলতা তাঁর আদর্শিক বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের কিছু নীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় এবং যে দলের জন্য যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, তা থেকে তিনি একসময় দূরে সরে যান। এই মোহভঙ্গ তাঁর কবিতায় গভীর বিষাদ ও অন্তর্মুখী চেতনার জন্ম দেয়, কিন্তু তিনি কখনো মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। দলছুট হলেও আমৃত্যু শোষিতের পক্ষে কথা বলে গেছেন। ‘চিরকুট’ বাংলা ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতার ধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এতে ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন, মন্বন্তরের স্মৃতি ও সংগ্রামী মানুষের অদম্য প্রত্যয় ফুটে উঠেছে। ‘ঘোষণা’ কবিতায় তিনি লেখেন: ‘গঙ্গার জোয়ার এসে লাগে ভল্গার তীরের স্পর্শ / চোখে নব সূর্যোদয় জাগে / মুক্তি আজ বীরবাহু শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব’। ‘অগ্নিকোণ’ ও ‘ফুল ফুটুক’-এর মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর কাব্যদৃষ্টিতে বড় রূপান্তর আসে। তিনি উপলব্ধি করেন প্রকৃত শিল্প সেখানেই যেখানে জীবনের বহুমাত্রিক সত্য প্রতিফলিত হয়। ফলে কৃত্রিম কাব্যভাষা ও স্লোগাননির্ভর উচ্চারণ ছেড়ে সাধারণ মানুষের সহজ, অনাড়ম্বর ভাষা ও চিত্রকল্পে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতা ভিন্ন শিল্পমাত্রা লাভ করে। ‘ফুল ফুটুক’-এর ‘আরও একটা দিন’ কবিতায় এর অনন্য প্রকাশ দেখা যায়।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার মূল চালিকা শক্তি ছিল কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণি। বাবু সংস্কৃতির আড়ালে সমাজকে সচল রাখা মানুষদেরই তিনি জয়গান গেয়েছেন। ‘স্বাগত’ ও ‘মিছিলের মুখ’ কবিতায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা মানুষের চিত্র ও মিছিলে দেখা এক মুষ্টিবদ্ধ শাণিত হাতের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় প্রেম কখনো সমাজবিচ্ছিন্ন নয়; প্রিয়ার চোখের প্রশংসার সময়ও চারপাশের অনাহারী মানুষের মুখ তাঁর মাথায় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদী নির্মমতা এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক হামলা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল; তিনি শান্তির পক্ষে কলম ধরেন এবং ‘ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক’ স্লোগানকে কাব্যিক রূপ দেন। সাধারণ মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ ছিল তাঁর ভাষা। তিনি কবিতার ভাষা থেকে গুরুগম্ভীর তৎসম শব্দ ও সংস্কৃতায়িত রূপ বাদ দিয়ে কলকাতার আটপৌরে চলিত বাংলা ও শ্রমজীবীর কথ্যভাষা এমনভাবে বুনেছিলেন যে তা এক নতুন ঘরানার জন্ম দেয়। তাঁর কবিতা পড়তে মনে হয় কেউ যেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছেন। জীবনের শেষভাগে ‘ছেলে গেছে বনে’ (১৯৭২) ও ‘একটু পা চালিয়ে ভাই’ (১৯৭৯)-এর মতো কাব্যগ্রন্থে তিনি অনেক বেশি অন্তর্মুখী ও দার্শনিক হয়ে ওঠেন; একাকিত্ব, বার্ধক্য ও জীবনের অমোঘ সত্যগুলো আঁকতে শুরু করেন। তবে এই শান্ত রূপেও অন্তর্নিহিত শক্তি লুকিয়ে ছিল। এই পর্বে তাঁর রাজনীতি দলগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সার্বিক মানবতাবোধে রূপান্তরিত হয়।

কবিতার বাইরেও সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী, সাহিত্য সমালোচনা এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর সৃষ্টি উল্লেখযোগ্য। ‘হাংরাস’, ‘কে কোথায় যায়’, ‘অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ’, ‘কমরেড, কথা কও’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ভ্রমণসাহিত্যে ‘আমার বাংলা’ একটি ক্ল্যাসিক রচনা; সহজ-সরল গদ্যে বাংলার গ্রামীণ জীবন ও সাঁওতাল বিদ্রোহের পটভূমি তুলে ধরেছেন তিনি। এছাড়াও ‘যখন যেখানে’, ‘ডাকবাংলার ডায়েরি’, ‘ক্ষমা নেই’, ‘ভিয়েতনামে কিছুদিন’ প্রভৃতি ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে নাজিম হিকমতের কবিতা, নির্বাচিত পাবলো নেরুদা, রোজেনবার্গ-এর পত্রগুচ্ছ, ‘ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একদিন’, ‘চে গুয়েভারার ডায়েরি’ ও ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’র মতো কালজয়ী গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘অক্ষরে অক্ষরে আদি পর্ব’, ‘দেশবিদেশের রূপকথা’, ‘বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল’ রচনার পাশাপাশি ‘কেন লিখি’ ও ‘একসূত্র’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকলন সম্পাদনা করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা বঞ্চনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হলেও সাহিত্যজগতে তিনি সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেন। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৬৪), অ্যাফ্রো-এশিয়ান লোটাস প্রাইজ (১৯৭৭), কুমারন আসান পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার (১৯৮৪) এবং ভারতীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৯২) তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। ১৯৯৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপে ভূষিত হন এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানে সম্মানিত করে। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই তাঁর প্রয়াণ ঘটলেও তাঁর সাহিত্যকীর্তি আজও সমানভাবে জীবন্ত। সময় যত এগিয়েছে, তাঁর কবিতা ততই নতুন অর্থে ফিরে এসেছে। সমাজে যখনই শোষণ, অবিচার বা ফ্যাসিবাদের অন্ধকার নেমেছে, প্রতিবাদী যুবসমাজ সাহস ও সংগ্রামের ভাষা খুঁজে পেয়েছে তাঁর লেখায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল তরুণ ‘পদাতিক’-এর কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামে অবিচল এক পথিক। তাঁর কবিতা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়, বরং ন্যায়, মানবমুক্তি ও প্রতিরোধের স্থায়ী কাব্যভাষা হয়ে মেহনতি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি ও লড়াইয়ের প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি চিরকাল আশার আলো জ্বেলেছে: ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত। / শান-বাঁধানো ফুটপাথে পাথরে পা ডুবিয়ে / এক কাঠখোট্টা গাছ / কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে।’