মার্কিন আবাসন বাজারে বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহে বিরাট ধস নেমেছে। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরসের (এনএআর)最新 প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ক্রেতারা মাত্র ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলারের পুরনো বাড়ি কিনেছেন। আগের বছরের তুলনায় এই অঙ্ক ১৯.১ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৯ সালে এনএআর এই তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন লেনদেনের সংখ্যা। মজার ব্যাপার হলো, এই পতন ঘটেছে যখন দুর্বল মার্কিন ডলার বিদেশি ক্রেতাদের জন্য আবাসনকে আরও সস্তা করার কথা ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ঐতিহাসিক উল্টো প্রবণতা—অতিধনী বিনিয়োগকারীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দ্রুত ছেড়ে দিচ্ছেন।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো নিউ ইয়র্কের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ক্রেতাদের শীর্ষ পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে থাকা নিউ ইয়র্ক এবার বাদ পড়েছে। তার জায়গায় এসেছে নিউ জার্সি ও জর্জিয়া। এনএআর-এর ব্যবসা ও ভোক্তা গবেষণা পরিচালক ও প্রতিবেদনের লেখক ম্যাট ক্রিস্টোফারসন ফরচুনকে বলেন, তিনি নিজেও অবাক হয়েছেন। নিউ ইয়র্ক সাধারণত শীর্ষ পাঁচের মধ্যে থাকে, কিন্তু এবার সেটি বাইরে চলে গেছে। ক্রিস্টোফারসন জানান, এই পতন মুদ্রা বিনিময় হারের সাধারণ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিদেশি ক্রেতাদের কেনার ক্ষমতা বেশি থাকলেও তারা পিছিয়ে এসেছে। তিনি এর কারণ হিসেবে বাণিজ্য নীতির ওঠানামা ও সম্পত্তি আইনের রাজ্যভিত্তিক পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন, তবে সরাসরি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে তথ্যটি না চাপানোর পরামর্শ দেন।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের কিছুদিন আগেই নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির প্রশাসন শহরের নতুন পিয়েড-আ-টের করের সম্ভাব্য সম্পত্তির একটি ডাটাবেস প্রকাশ করে। এতে এক মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অ-প্রধান বাসস্থানের লাখ লাখ নাম ও ঠিকানা রয়েছে। সিটি হল জানিয়েছে, এই কর বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, যদিও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী তা ৩৪০ থেকে ৩৮০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। সমালোচকরা এই ডাটাবেসকে 'ডক্সিং' (ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ) বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এতে বিলাসবহুল পেন্টহাউসের পাশাপাশি শপিং সেন্টার ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের বাড়িও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিদেশি ক্রেতাদের মার্কিন বাজার থেকে সরে আসার পাশাপাশি মার্কিন ধনীদের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সিটি ওয়েলথের গ্লোবাল হেড ডার্লিন প্যাটারসন জানান, তিনি তার ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো মার্কিন ক্লায়েন্টদের দেশের বাইরে সম্পদ রাখতে চাইতে শুনেছেন। তবে তিনি একে পলায়ন নয়, বরং 'বিকল্প' (অপশনালিটি) হিসেবে দেখছেন। ক্লায়েন্টরা ইতালি, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে গোল্ডেন ভিসা নিচ্ছেন। সিটি ওয়েলথের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে ৩.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার হংকং, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো হাবে স্থানান্তরিত হবে। অন্যদিকে, অ্যাপেক্স ক্যাপিটাল পার্টনার্সের নুরি কাটজ বলেছেন, ৩৪ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি আগে কখনো এত মার্কিন ধনীকে দেশ ছাড়ার কথা ভাবতে দেখেননি। তার প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ২০০ হাজার ডলারের বেশি আয়কারী ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথা ভাবছেন। জীবনযাত্রার খরচ ও কর (৬৮%) রাজনীতির (৫৪%) চেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। কাটজ সতর্ক করে বলেন, ডলার চিরদিনের জন্য রিজার্ভ কারেন্সি থাকবে না এবং শিগগিরই এর পতন ঘটতে পারে।

বিদেশি ক্রেতাদের জন্য পর্তুগাল এখন শীর্ষ দুই গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে, তবে দেশটি ইতিমধ্যেই আবাসিক রিয়েল এস্টেটের গোল্ডেন ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। ক্রিস্টোফারসন মনে করেন, পর্তুগালের জনপ্রিয়তা নীতি প্রণোদনার চেয়ে 'হাইপ' বা সামাজিক প্রচলনের কারণে বেশি। সামগ্রিকভাবে, তিন বিশেষজ্ঞই একমত যে এই প্রবণতা মূলধন পলায়ন নয় বরং অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বীমা। কিন্তু দিকনির্দেশনা স্পষ্ট—মার্কিন বাজার থেকে দূরে।