আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। দেশটির সাল দ্বীপের এমিলকার কাব্রাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা চোখে পড়ে যায়। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই দেখা মেলে আর্জেন্টিনার পতাকার, যা বহু ভবনে উড়তে থাকে। কাতারে তখন ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের আসর জমজমাট। বাংলাদেশ থেকে জার্মানি হয়ে ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দর থেকে উড়ে আসা এই পর্যটক সাল দ্বীপে পা রাখেন ৩ ডিসেম্বর। এটি ছিল তাঁর বিশ্বভ্রমণের ১৫৯তম গন্তব্য।

সাল দ্বীপের রুক্ষ পাহাড় ও সোনালি উপকূল তাঁকে মুগ্ধ করে। তবে বেশি আকর্ষণ করে ফুটবলপ্রেমী মানুষদের উচ্ছ্বাস। খেলার দিন যেকোনো রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেতে দর্শকের ভিড় লেগেই থাকে। কেউ বড় পর্দায়, কেউ টেলিভিশনে ম্যাচ উপভোগ করছে। পর্যটকবাহী গাড়িতেও খেলা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। ১৮ ডিসেম্বর ফাইনালের দিনটি এসে হাজির হয়। আগে থেকে ঠিক করে রাখা ছিল সাল দ্বীপের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসেই ম্যাচ দেখবেন।

সন্ধ্যার আগে একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেন তিনি। সেখানে অর্ডার দেন কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহী খাবার ক্যাচুপা। ভুট্টা, শিম, মিষ্টি আলু, কাসাভা, কাঁচকলা, ইয়াম ও মাংস দিয়ে তৈরি এই খাবারের স্বাদ অনেকটা বাংলাদেশের খিচুড়ির মতো। নতুন দেশে পৌঁছে সেখানকার খাবারই সংস্কৃতি জানার প্রথম জানালা বলে মনে করেন তিনি।

খেলা শুরু হতেই রেস্তোরাঁ দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে দুই শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। কারও গায়ে মেসির জার্সি, কারও এমবাপ্পের। আর্জেন্টিনা গোল করলে একদল উল্লাসে মেতে ওঠে, আবার ফ্রান্স সমতা ফেরালে আরেক দল উচ্ছ্বাস করে। একপর্যায়ে কয়েকজন সমর্থকের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলেও উপস্থিত লোকজন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বিদ্বেষের কোনো জায়গা ছিল না।

শেষ বাঁশি বাজতেই রেস্তোরাঁয় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। চারদিকে করতালি, গান, গাড়ির হর্ন ও উল্লাস। নীল-সাদা পতাকা উড়ে, অপরিচিত ব্যক্তিরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। এই আনন্দমিছিলে মিশে যান বাংলাদেশি পর্যটকও।

আটলান্টিকের এই ছোট্ট দ্বীপে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব দূরত্ব যেন মিলিয়ে গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের জয় উদযাপন করছে আফ্রিকার উপকূলের একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, আর সেই উৎসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বাংলাদেশি। ভাষা, জাতি, ধর্ম বা মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে ফুটবল মানুষকে কী অসাধারণভাবে একসূত্রে বেঁধে ফেলে, সেদিন তা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন তিনি।

কেপ ভার্দে সম্প্রতি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। আর্জেন্টিনাসহ প্রতিটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দারুণ লড়াই করেছে ছয় লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার এই দেশটি। আগে জানা থাকলেও তাঁদের এতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলার সামর্থ্য ছিল অজানা। বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছে কেপ ভার্দে।