যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি নির্ভরতার ব্যাপক সম্প্রসারণের পর এবার উদ্বেগজনক ফলাফল সামনে এসেছে। ২০০২ সালে মেইন রাজ্য প্রথমবারের মতো রাজ্যব্যাপী ল্যাপটপ কর্মসূচি চালু করে। তৎকালীন গভর্নর অ্যাঙ্গাস কিং মনে করেছিলেন, এই উদ্যোগ শিশুদের হাতে ইন্টারনেট পৌঁছে দেবে এবং তারা জ্ঞানের জগতে ডুবে যেতে পারবে। সেই বছর মেইন লার্নিং টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ ২৪৩টি মিডল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৭ হাজার অ্যাপল ল্যাপটপ বিতরণ করে। ২০১৬ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ হাজারে। কিংয়ের সেই প্রচেষ্টা পরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্কুলে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট সরবরাহে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে।

কিন্তু সাড়ে ২৫ বছর পেরিয়ে এবং প্রযুক্তির বিবর্তনের একাধিক ধাপ অতিক্রম করার পর, মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা কিংয়ের প্রত্যাশিত ফলাফলের বিপরীত চিত্র দেখতে পেয়েছেন। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে সহায়তা না করে বরং উল্টো প্রভাব ফেলেছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমার্স, সায়েন্স অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টেশন কমিটির কাছে লিখিত সাক্ষ্যে নিউরোসায়েন্টিস্ট জ্যারেড কুনি হোরভাথ বলেছেন, জেন জি প্রজন্ম প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আগের প্রজন্মের তুলনায় জ্ঞানগতভাবে কম সক্ষম। তিনি উল্লেখ করেন, জেন জিই আধুনিক ইতিহাসে প্রথম প্রজন্ম যারা স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষায় আগের প্রজন্মের চেয়ে কম নম্বর পেয়েছে। হোরভাথের মতে, সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের মতো দক্ষতা সবসময় বুদ্ধিমত্তার সঠিক পরিমাপক না হলেও তা জ্ঞানগত সক্ষমতার প্রতিফলন। গত এক দশকে এই সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচির তথ্য এবং অন্যান্য স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে হোরভাথ দেখিয়েছেন, স্কুলে কম্পিউটারে বেশি সময় কাটানো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল আরও খারাপ হয়েছে। তিনি অভিযুক্ত করেছেন, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার শিক্ষার ক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে ক্ষীণ করেছে। ২০০৭ সালে আইফোনের আগমনও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। হোরভাথ লিখেছেন, “এটি প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যানের বিতর্ক নয়। এটি শিক্ষার সরঞ্জামগুলিকে মানব শেখার প্রকৃত প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রশ্ন। প্রমাণ বলছে, নির্বিচারে ডিজিটাল সম্প্রসারণ শিক্ষার পরিবেশকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করেছে।”

এর আগেও ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৭ সালে ফরচুন রিপোর্ট করে, মেইনের পাবলিক স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল ১৫ বছরে উন্নত হয়নি। তৎকালীন গভর্নর পল লিপেজ এই কর্মসূচিকে ‘বৃহৎ ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেন, যদিও রাজ্য অ্যাপলের সাথে চুক্তিতে বিপুল অর্থ ঢেলেছে। এখন জেন জি প্রজন্মকে এই ক্ষয়িষ্ণু শেখার ক্ষমতার পরিণতি মোকাবিলা করতে হবে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে প্রবেশকারী কর্মীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। হোরভাথ সতর্ক করে বলেন, কম সক্ষম জনগোষ্ঠী শুধু চাকরি ও পদোন্নতির সম্ভাবনাই কমায় না, বরং ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতাও হ্রাস করে।

শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রতি ব্যাপক বেড়েছে। ২০২১ সালের এডউইক রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৮৪৬ শিক্ষকের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বলেছেন, তারা প্রতিদিন এক থেকে চার ঘণ্টা শিক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। আর এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক পাঁচ ঘণ্টা ব্যবহারের কথা জানান। তবে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই সরঞ্জামগুলি অশিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করে। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের কম্পিউটারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় পাঠ্যবহির্ভূত কাজে ব্যয় করে। হোরভাথ এই বিচ্যুতিকেই প্রযুক্তির শিক্ষা বাধাগ্রস্ত করার মূল কারণ বলে মনে করেন। মনোযোগ বিঘ্নিত হলে পুনরায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে এবং টাস্ক-সুইচিং দুর্বল স্মৃতিশক্তি ও বেশি ভুলের সাথে যুক্ত।

স্যান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিন টোয়েঞ্জের মতে, বর্তমান প্রযুক্তির ব্যবহার পদ্ধতি একক বিষয়ে টেকসই মনোযোগের পরিপন্থী। তিনি ফরচুনকে বলেন, “অনেক অ্যাপ, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমিং অ্যাপ, আসক্তিমূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে। তাদের ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহারকারীদের যত বেশি সম্ভব সময় অ্যাপে কাটানো এবং ঘন ঘন ফিরে আসার উপর ভিত্তি করে।” বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকটক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সবচেয়ে কম প্রচেষ্টা দাবি করে, যা ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টসের চেয়েও কম। সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি এতটাই উদ্বেগজনক যে, ৩৫০ পরিবার ও ২৫০ স্কুল জেলার ১ হাজার ৬০০ বাদী মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

সমাধানের জন্য হোরভাথ শ্রেণিকক্ষের প্রযুক্তি ব্যবহারে কংগ্রেসের কাছ থেকে কার্যকারিতার মান নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, আইন প্রণেতারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ডেটা সংগ্রহ ও ট্র্যাকিংয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। কিছু স্কুল নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৭টি রাজ্য স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং ৩৫টি রাজ্যে ক্লাসরুমে ফোন ব্যবহার সীমিত করার আইন আছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশের বেশি স্কুলে অশিক্ষামূলক কাজে ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ নীতি থাকলেও তা বাস্তবায়নে সাফল্য ভিন্ন। শেষ পর্যন্ত হোরভাথ বলেন, সমালোচনামূলক চিন্তা ও শেখার দক্ষতা হারানো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় বরং নীতিগত ব্যর্থতা। তিনি জেন জি প্রজন্মকে প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার ব্যর্থ পরীক্ষার শিকার হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, “আমি কিশোরদের সাথে কাজ করার সময় বলি, ‘এটি তোমাদের দোষ নয়। তোমাদের কেউ চায়নি পুরো স্কুলজীবন কম্পিউটারের সামনে বসে কাটাতে।’ এর অর্থ আমরাই ভুল করেছি। আমি সত্যিই আশা করি জেন জি দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পারবে এবং রাগান্বিত হবে।”