জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নিহতদের মায়েরা জানিয়েছেন, তাঁরা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ভিডিওতে নিজ সন্তানদের ওপর হামলাকারী ও গুলি চালানো ব্যক্তিদের স্পষ্ট শনাক্ত করতে পেরেছেন। তা সত্ত্বেও ঘটনার প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও কোনো পক্ষেরই বিচার না হওয়ায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

রোববার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘২০২৪-এর রক্তিম বর্ষার সন্তান হারানো মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন শহীদদের মায়েরা। প্রধান অতিথির আসনে ছিলেন গণ–অভ্যুত্থানে সন্তান হারানো জননীরা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও যুদ্ধে আহত ব্যক্তিরা।

নিজ সন্তানকে হারানোর বেদনার্ঘ বিবরণ দিতে গিয়ে শহীদ ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমের মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি সিসি ক্যামেরায় দেখেছি, কারা আমার ছেলেকে গুলি করেছে, মেরেছে, টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সবাইকে চিনি। কিন্তু কারও বিচার হচ্ছে না।’ তিনি সরকারের কাছে জোর দাবি জানান, কেবল তার একার সন্তান নয়, বরং এই অভ্যুত্থানে নিহত প্রত্যেকটি সন্তানের বিচার যেন নিশ্চিত করা হয়।

অপর এক শহীদ সন্তানের মা মেহেরুন্নেসা তানহার মা আছমা আক্তার প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, জুলাই সনদের যথাযথ বাস্তবায়ন, হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ এবং আক্রান্তদের সার্বিক দেখভালের গুরুদায়িত্ব যদি সরকার পালনে ব্যর্থ হয়, তবে এই যন্ত্রণা তাদের সারাজীবন বুকে বয়ে নিতে হবে।

একই সুরে শহীদ মেহেদী হাসানের মা পারভীন আক্তার বক্তব্য দেন। তার মতে, নির্দোষ পুত্রকে পুলিশ দ্বারা তিনটি গুলি করা হয়েছিল। দুই বৎসর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিচার পাননি, এমনকি ভবিষ্যতে বিচার পাবেন বলেও কোনো আস্থা তৈরি হচ্ছে না। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরাও সমর্থন জানান। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ মন্তব্য করেন, একটি মহল চব্বিশের স্মৃতি মুছে ফেলতে সক্রিয় চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন, আপনারা সেটা পারবেন না। কারণ, চব্বিশে কী ঘটে গেছে, সেটা এই দেশে যাঁরা ছিলেন, একমাত্র তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারবেন।’

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জাতীয় নাগরিক দলের (এনসিপি) সাংসদ নুসরাত তাবাসসুম শহীদ জননীদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, তাদের ত্যাগের কারণেই নতুন বাংলাদেশের দেখা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ভাষায়, ‘নতুন বাংলাদেশ অর্জনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের সেই রক্তের দাম আমরা এখনো দিতে পারিনি।’ তিনি সতর্ক করে দেন, ‘জুলাইয়ের শহীদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ যদি আমরা গড়তে না পারি, সেটা হবে শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।’ তিনি আরও বলছেন, দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে শহীদদের বিস্মৃত করতে শুরু করেছে সমাজ এবং ক্ষমতার আসনে থাকা ব্যক্তিরা চান যে সবকিছুই যেন পুরানো নিয়মেই চলতে থাকে।

অনুষ্ঠানের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের উপস্থিতিতে জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়ক একটি দেশাত্মবোধক গানের অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রকাশ। আসিফ আকবর ঘোষণা দেন যে গানটি থেকে আগামী ৬০ বছরে অর্জিত সমুদয় অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশনের তহবিলে দান করা হবে। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন, ফাউন্ডেশনটিকে টিকিয়ে রাখা সরকারের নৈতিক বাধ্যবাধকতা, কেননা প্রতিষ্ঠানটি নিহত পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ করে। নিজের শিল্পীসত্তার জায়গা থেকে ফাউন্ডেশনকে সার্বিক সহায়তায় সদাসচেষ্ট থাকার অঙ্গীকারও করেন তিনি।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান। এছাড়া শহীদ রমিজ উদ্দিন আহমেদের মা রাবেয়া সুলতানা ও শহীদ গোলাম নাফিজের মা নাজমা আক্তার প্রমুখও বক্তব্য দেন।