বাংলাদেশের লোকসংগীতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যারা কেবল শিল্পী নন, একটি সাংস্কৃতিক ধারার অগ্রদূত হিসেবে চিরস্মরণীয়। আবদুল গফুর হালী তাদেরই একজন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, মাইজভাণ্ডারী সংগীত ও লোকঐতিহ্যকে এমনভাবে ধারণ করেছেন যা তাকে স্থানীয় সীমানা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর সৃষ্টি আজও আধ্যাত্মিক আসর থেকে শুরু করে লোকসংগীতের মঞ্চ পর্যন্ত সমানভাবে সমাদৃত।

১৯২৯ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গীতিকার, সুরকার ও লোকশিল্পী। তাঁর পিতা আবদুস সোবহান এবং মাতা গুলতাজ খাতুন। রশিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জোয়ারা বিশ্বম্ভর চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও বিভিন্ন কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন দীর্ঘ হয়নি। তবে এই সীমাবদ্ধতা কখনো তাঁর সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। শৈশব থেকেই পুঁথিপাঠ, লোকগান এবং পালাগানের পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিংবদন্তি পুঁথিকার আস্কর আলী পণ্ডিতের সৃষ্টিকর্ম তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ধীরে ধীরে লোকসংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা। দীর্ঘ এই পথচলায় মাইজভাণ্ডারী, মুর্শিদি, মারফতি, হামদ, নাত এবং আঞ্চলিক লোকগান — সব ধারাতেই তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। নিজের বেশিরভাগ গানের সুরও তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। তাঁর গানের ভাষা অত্যন্ত সহজ হলেও ভাবের গভীরতা প্রবল। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, মানবিকতা এবং জীবনসংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর সৃষ্টিতে।

চাটগাঁইয়া ভাষায় লোকনাটক রচনায়ও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ‘গুলবাহার’, ‘নীলমণি’ ও ‘আশেক বন্ধু’সহ তিনি অন্তত ছয়টি লোকনাটক রচনা করেছেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লোকনাট্যচর্চার বিকাশে তাঁর এই ভূমিকা বিশেষভাবে স্বীকৃত।

তাঁর রচিত গান দেশের বহু খ্যাতিমান শিল্পীর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা লাভ করে। শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, সঞ্জিত আচার্য, শিমুল শীল এবং সেলিম নিজামীর মতো শিল্পীরা তাঁদের কণ্ঠে এই গানগুলো পরিবেশন করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষত মাইজভাণ্ডারী সংগীতের আসরে তাঁর গান আজও অপরিহার্য হয়ে আছে। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহের পাশাপাশি তাঁর গানের মানবিক আবেদনই তাকে সাধারণ মানুষের শিল্পীতে পরিণত করেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আবদুল গফুর হালী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সক্রিয় অংশীদার ছিলেন। দেশাত্মবোধক গান গেয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। যুদ্ধের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি শিল্পচর্চা চালিয়ে যান, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের চেতনা জাগাতে গান একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

তাঁর সৃষ্টিকর্ম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হান্স হার্ডার তাঁর মাইজভাণ্ডারী গান নিয়ে গবেষণা করে ৭৬টি গান জার্মান ভাষায় একটি গ্রন্থে প্রকাশ করেন। ২০১০ সালে নির্মাতা শৈবাল চৌধুরী তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে ‘মেঠোপথের গান’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর অসংখ্য গান কপিরাইট সুরক্ষার আওতায় আসে, যা তাঁর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর প্রয়াণেও সৃষ্টির ধারা থেমে থাকেনি। আজও চট্টগ্রামের গ্রামবাংলা, মাইজভাণ্ডারী মাহফিল এবং লোকসংগীতের নানা মঞ্চে তাঁর গান সমান আবেগে পরিবেশিত হয়। লোকসংগীত যে শুধু বিনোদন নয়, একটি জনপদের ইতিহাস, ভাষা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারক — আবদুল গফুর হালী তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে এই সত্যই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার লোকগানকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।