বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জেফ বেজোসের ক্রীড়া জগতে অভিষেক হতে যাচ্ছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লিভারপুলের মাধ্যমে। সোমবার স্কাই স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে লিভারপুলের এক-তৃতীয়াংশ শেয়ার কিনতে চলেছেন। এই লেনদেনে ক্লাবটির মূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
বেজোসের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২৮৩.৮ বিলিয়ন ডলার, যা তাকে বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও সম্প্রতি লাইভ স্পোর্টস সম্প্রচারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে উঠলেও, এটি হবে বেজোসের কোনো বড় পেশাদার ক্রীড়া দলে সরাসরি প্রথম বিনিয়োগ। কনসোর্টিয়ামে একাধিক সদস্য থাকায় লিভারপুলের নিয়ন্ত্রণে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদার হবেন না, তবে ইংলিশ লিগের ২০ বারের চ্যাম্পিয়ন এই ক্লাবে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে ক্রীড়া মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগে আমেরিকান ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) দল ওয়াশিংটন কমান্ডার্স কেনার সম্ভাবনার খবর শোনা গেলেও তা আর এগোয়নি। এবার সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি কেন নিচ্ছেন তিনি, তা নিয়ে চারটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে।
প্রথমত, যদিও ৬ বিলিয়ন ডলার একটি বিশাল অঙ্ক, এটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি ডালাস কাউবয়েজের বাজারমূল্যের (১৩ বিলিয়ন ডলার) অর্ধেকেরও কম। কিন্তু লিভারপুলের বিশ্বব্যাপী ভক্তসংখ্যা কয়েকশ মিলিয়ন, যা প্রিমিয়ার লিগের নজিরবিহীন বৈশ্বিক সম্প্রচারের কারণে সম্ভব হয়েছে। এনএফএল দলগুলোর ভক্তরা মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ, যার কারণেই তাদের মূল্যায়ন এত বেশি। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলের বিশাল পরিসর বিবেচনায় লিভারপুলের মতো ক্লাব বিনিয়োগের বিপরীতে আরও বেশি মূল্য দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের যুক্তি।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ বিশ্বকাপের পরপরই বৈশ্বিক ফুটবল ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এটি একটি অনুকূল সময় হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ দেখে নতুন করে ফুটবলমুখী হওয়া দর্শকরা এমএলএস বা দেশীয় অন্যান্য লিগের বদলে প্রিমিয়ার লিগ দেখেই তাদের আগ্রহ ধরে রাখবেন। গত ১৯ জুলাই স্পেন-আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক দেখেছেন, যা ১৯৯৪ শীতকালীন অলিম্পিকের পর দেশটিতে সবচেয়ে বেশি দেখা নন-এনএফএল ক্রীড়া ইভেন্ট। এনবিসিতে প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচারও ইতোমধ্যে এনবিএ বা এমএলবির নিয়মিত মৌসুমের সম্প্রচারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
তৃতীয়ত, এনএফএল-এর ৩২টি দলের মধ্যে আয় ভাগাভাগির প্রচলন থাকলেও লিভারপুলের মতো বড় ফুটবল ক্লাবগুলো তাদের নিজস্ব আয়ের উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। প্রিমিয়ার লিগের টিভি চুক্তির অর্থ আংশিকভাবে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বিতরণ করা হয়, ফলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্লাবগুলো বেশি অর্থ পায়। এছাড়া এনএফএল-এর মতো নয়, ফুটবল ক্লাবগুলো তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, ম্যাচডে আয় এবং পণ্য বিক্রির সম্পূর্ণ অর্থ নিজেদের কাছে রাখে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় ফুটবলের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা যদি টেকসই হয়, তবে এর আয়ের সম্ভাবনা দেশীয় লিগগুলোর চেয়েও বেশি হতে পারে।
সবশেষে, দীর্ঘ খরা কাটিয়ে লিভারপুল গত সাত মৌসুমে দুইবার প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পদ ছেড়ে দেওয়ায় ইংলিশ ফুটবলে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। লিভারপুল অবশ্য একমাত্র দল নয় যে এই সুযোগ নিতে চাইবে, তবে সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহ্যের সমন্বয়ে তারা সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান দাবিদার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক মডেলের মতো সমতা (প্যারিটি) ফুটবলে নেই; ১৯৯০-এর দশকের গোড়া থেকে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র সাতটি ক্লাব শিরোপা জিতেছে। তাই যদি লিভারপুল আবারও শীর্ষে উঠে আসে, তবে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে।




