কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মীর্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা-ইনে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো নয়জন পর্যটকের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন গতকাল পুলিশের হাতে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিহতদের মৃত্যু হয়েছে দমবন্ধ হয়ে। যদিও তাদের দেহের বিভিন্ন স্থানে পোড়ার ক্ষতও শনাক্ত হয়েছে। নিহত নয়জনের মধ্যে সাতজনের বাড়ি বাংলাদেশে। এই তালিকায় রয়েছেন কুষ্টিয়া জেলার একজন সাংবাদিক এবং তার পরিবারের তিন সদস্য। বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুতে ঘটনাটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

দুর্ঘটনার পর থেকেই হোটেলটির মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে খুঁজে বের করতে পারেনি কলকাতা পুলিশ। চার দিন পার হলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। সম্প্রতি কলকাতার লালবাজারের পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহার কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে দিঘা ও মন্দারমণিসহ পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলো সরকারি নিয়মকানুন মেনে চলছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের সন্দেহ, বীরেশ্বর মিত্র তার নিউ দিঘা ও মন্দারমণির হোটেলে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। সেজন্য ওই এলাকাগুলোতেও তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, বীরেশ্বর মিত্র শুধু মীর্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা-ইনের মালিক নন। ওই ভবনের তৃতীয় তলায় ছিল শিখা-ইন, যা তিনি এগারো মাসের চুক্তিতে আবু জাফর নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে ইজারা দিয়েছিলেন। একই ভবনের পঞ্চম তলায় তার আরেকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যা উমেশ সিং ও জিতেন সিং নামের দুই ব্যবসায়ীর নামে ইজারা দেওয়া ছিল। পুলিশ ইতিমধ্যে উমেশ ও জিতেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত এই ঘটনায় মোট ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা হোটেল পরিচালনার দায়িত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন।

দুর্ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং কলকাতা পৌর করপোরেশন যৌথভাবে অন্তত পঞ্চাশটি হোটেল ও গেস্টহাউসে পরিদর্শন চালিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই হোটেল বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। ফলে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপযুক্ত জবাব না দিলে এসব হোটেল-গেস্টহাউসের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত হোটেল শিখা-ইনের ফায়ার সার্ভিস বিভাগের কোনো ছাড়পত্র ছিল না। নিউমার্কেট এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে এখন ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্থাপন এবং জরুরি নির্গমন পথ ঠিক করার কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। গতকাল পর্যন্ত কলকাতা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও পৌর করপোরেশন প্রায় পঞ্চাশটি হোটেল-গেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁয় নোটিশ লাগিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে নিউমার্কেট এলাকায় সতেরোটি, মীর্জা গালিব স্ট্রিটে তেরোটি, মারকুইস স্ট্রিটে পনেরোটি, এসএন ব্যানার্জি রোডে একটি এবং তপশিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কোনো কোনো হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধ করে দেওয়ার নোটিশও দেওয়া হয়েছে।