যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা মরুভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত একটি গোপন স্থান হলো এরিয়া ৫১। সাধারণ মানচিত্রে এই জায়গাটির স্পষ্ট কোনো নাম না থাকলেও এটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের যেন শেষ নেই। অনেকের ধারণা, এই ঘাঁটিতে ভিনগ্রহের প্রাণী এলিয়েনদের উড়ন্ত যান লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ গোপন সামরিক ঘাঁটি কীভাবে বিশ্বজুড়ে এলিয়েন ও ইউএফওর আস্তানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করল? সত্যিই কি সেখানে ভিনগ্রহের কোনো যান এসেছিল, নাকি পুরোটাই কল্পকাহিনী?
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০১৩ সালের আগে পর্যন্ত এই ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করত না। ফলে জায়গাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়ে যায় এবং অনেকে মনে করতে শুরু করেন যে সেখানে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের উন্নত প্রযুক্তি লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এলিয়েন থাকার কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও বিমানবাহিনী সেখানে ইউ-২ ও এ-১২ নামের অত্যাধুনিক গুপ্তচর বিমান তৈরি করত। আকাশে ওড়ার সময় এই অদ্ভুত আকৃতির ও প্রচণ্ড দ্রুতগতির বিমান দেখে সাধারণ মানুষ সেগুলোকে ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান ভেবে ভুল করেছিল। পেন্টাগনের তদন্তেও দেখা গেছে, নিজেদের গোপন বিমানের গবেষণা আড়াল করতেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী হয়তো ইউএফওর এসব গল্প ছড়িয়ে দিয়েছিল। আজও এরিয়া ৫১ একটি সক্রিয় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে সেখানকার কাজ ও আসল ইতিহাস এখনো গোপন রয়ে গেছে।
ভিনগ্রহের প্রাণ নিয়ে গবেষণাকারী বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান সেটি (SETI)-এর প্রধান নির্বাহী বিল ডায়মন্ডের মতে, ইউএফও ও এরিয়া ৫১ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের মূল কারণ মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করতে চায় বিশাল এই মহাবিশ্বে আমরা একা নই এবং অন্য কোথাও হয়তো আরও বুদ্ধিমান প্রাণী রয়েছে। সেই থেকে নেভাডার মরুভূমির সীমা ছাড়িয়ে মহাবিশ্বে ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে।
লাস ভেগাস শহর থেকে প্রায় ১২০ মাইল দূরে নেভাডার এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল হাইওয়েতে একটি মাটির রাস্তা রয়েছে। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তবে এই নির্জন রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে পৌঁছানো যায় গ্রুম লেক ও হোমি এয়ারপোর্ট এলাকায়। এই গোপন পথটিই চলে গেছে সেই রহস্যময় সামরিক ঘাঁটির পেছনের গেটে। সরকারি খাতায় যা-ই থাকুক, মানুষ একে প্যাভিলিয়ন র্যাঞ্চ, ড্রিমল্যান্ড রিসোর্ট কিংবা এরিয়া ৫১ নামে চেনে। সাধারণ মানুষের জন্য এই ঘাঁটির ভেতরে ঢোকা একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে এই ঘাঁটিকে ঘিরে আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে এলিয়েনভিত্তিক নানা রেস্তোরাঁ, হোটেল ও জাদুঘর। প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষ নিউ মেক্সিকোর রসওয়েলে অবস্থিত বিখ্যাত ইউএফও জাদুঘর দেখতে ভিড় জমান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে গ্রুম লেকের আশপাশের এলাকায় রূপা ও সীসার খনি ছিল। পরে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি বড় নির্জন জায়গার প্রয়োজন হয়। তাই ১৯৫০ সালে তারা প্রায় ২৯ লাখ একর জমি নিয়ে তৈরি করে নেভাডা টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জ। এই সংরক্ষিত এলাকায় প্রায় ৯০০টির বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, যার খুব কাছেই গ্রুম লেক অবস্থিত। এরপর স্নায়ুযুদ্ধের সময় সিআইএ গোপন গুপ্তচর বিমান পরীক্ষার জন্য একটি নির্জন জায়গা খুঁজছিল। ১৯৫৫ সালে সিআইএ ও বিমান নকশাকার কেলি জনসন গ্রুম লেকের এই রানওয়েটিকে পছন্দ করেন এবং মানচিত্রে এর নাম দেন এরিয়া ৫১। মাত্র আট মাসের মধ্যে এখানকার প্রকৌশলীরা ইউ-২ নামের একটি বিমান তৈরি করেন। এটি ৭০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়তে পারত, যা শত্রুদেশের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের বাইরে ছিল। ১৯৬০ সালে একটি ইউ-২ বিমান ভেঙে পড়লে তারা তৈরি করেন আরও উন্নত এ-১২ বিমান। শক্ত টাইটানিয়াম দিয়ে তৈরি এই দ্রুতগতির বিমানটি রাডারে ধরা পড়ত না এবং ৯০ হাজার ফুট ওপর থেকেও মাটিতে থাকা ছোট বস্তুর পরিষ্কার ছবি তুলতে পারত।
১৯৮৯ সালে বব লাজার নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি এরিয়া ৫১-এ পদার্থবিদ হিসেবে কাজ করেছেন এবং সেখানে ভিনগ্রহের মহাকাশযান নিয়ে গবেষণা করা হতো। পরে দেখা যায়, তাঁর পড়াশোনা ও চাকরির দাবিগুলোর কোনো সত্যতা নেই। তবে একটি তথ্য সত্য ছিল: সেখানে সত্যি উন্নতমানের বিমানের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলত, কিন্তু সেগুলো ভিনগ্রহের কোনো যান ছিল না। এরিয়া ৫১ থেকে এ-১২-এর মতো দ্রুতগতির গোপনীয় সামরিক বিমানের হাজার হাজার পরীক্ষা চালানো হতো। টাইটানিয়ামের তৈরি এই বিমানগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করত এবং দূর থেকে সাধারণ মানুষ এগুলো দেখেই এলিয়েনদের উড়ন্ত যান বা ইউএফও ভেবে ভুল করত। এই রহস্যের কারণে এলাকাটি পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে ইন্টারনেটে 'স্টর্ম এরিয়া ৫১' ট্রেন্ডের কারণে হাজার হাজার মানুষ এলিয়েনের খোঁজে মরুভূমিতে জড়ো হন। তবে স্থানটির খুব কাছে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এলাকাটি 'নো-ফ্লাই জোন' এবং এলাকাজুড়ে রয়েছে সশস্ত্র প্রহরী ও হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা। অনুমতি ছাড়া ঢুকলে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হয়। ২০১৯ সালে সেখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করায় দুই ইউটিউবারকে জেল ও মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়েছিল।



