শ্রীনগর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের জনপদ বারামুলা। কাশ্মীরের এই অঞ্চলে ক্রিকেটের তেমন কোনো মাঠ ছিল না। সরু গলিতে বোলিংয়ের জন্য রান-আপ নেওয়ার সোজা জায়গাও প্রায়ই পাওয়া যেত না, আর শীতকালে খেলা বন্ধই থাকত। এমনই এক প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন আকিব নবী দার, যিনি চোটের কারণে শ্রীলঙ্কা সফরের টেস্ট দল থেকে ছিটকে পড়া যশপ্রীত বুমরার বদলি হিসেবে ভারতীয় দলে ডাক পেয়েছেন।

নবীর শৈশবের প্রাথমিক আবেগ ছিল ফুটবল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জোরে বল ছোড়ার নেশা তাকে টেনে আনে ক্রিকেটে। সরকারি স্কুলশিক্ষক বাবার ছেলে হিসেবে ক্রিকেট পরিকাঠামোহীন এক শহরে বেড়ে ওঠা তার জন্য সহজ ছিল না। ২০১৬-১৭ মৌসুমে বারামুলার একটি ছোট মাঠে টেনিস বল ক্রিকেটের এক ম্যাচে তার লড়াকু ইনিংস দেখে প্রতিপক্ষের অধিনায়ক মুগ্ধ হন এবং বিসিসি রেডস ক্লাবে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেন। সেই সময় নবী মূলত ছিলেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার। কিন্তু দীর্ঘ অনুশীলন ও নিষ্ঠায় সেই ব্যাটারই ধীরে ধীরে পরিণত হন একজন বিশেষজ্ঞ পেস বোলারে।

জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে ২০১৯-২০ মৌসুমে ঝাড়খ-এর বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফিতে তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। প্রথম ইনিংসে উইকেটশূন্য থাকলেও দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি দলকে ইনিংস ব্যবধানে জয় এনে দেন। ২০২৪-২৫ রঞ্জি মৌসুমে মাত্র ১৩.৯৩ গড়ে তিনি শিকার করেন ৪৪ উইকেট। এরপর আসে ২০২৫-২৬ মৌসুম, যা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৭ ইনিংসে মাত্র ১২.৬৫ গড়ে ৬০ উইকেট নিয়ে তিনি শুধু গোটা আসরের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারীই হননি, বরং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাবও অর্জন করেন। বাংলাদেশের (বাংলা) বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে ৯ উইকেট নিয়ে তিনি জম্মু-কাশ্মীরকে ৬৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রঞ্জি ফাইনালে পৌঁছে দেন। আর ফাইনালে ৫৪ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে দলকে প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদও এনে দেন।

তার ধারাবাহিকতা কেবল লাল বলের ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়, আইপিএলের পরিসংখ্যানও চিত্তাকর্ষক। শেষ দুই মৌসুমে তিনি মোট ১০৪ উইকেট দখল করেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪৩ ম্যাচে তার শিকার ১৬২ উইকেট, গড় ১৮.৬৩। এর মাঝে ২০২৫ সালের দুলীপ ট্রফিতে ইস্ট জোনের বিপক্ষে টানা চার বলে চার উইকেট নিয়ে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়া মাত্র পঞ্চম ভারতীয় বোলার হন।

তবে আইপিএলের দরজা তার জন্য বহুদিন বন্ধ ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ মৌসুমে দিল্লি ক্যাপিটালস তাকে দলে টেনে নেয়। ভারত ‘এ’ দলের সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কা সফরে দুই ম্যাচে ছয় উইকেট নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাচকদের দৃষ্টি আরও জোরালোভাবে আকর্ষণ করেন। শেষমেশ এল সেই প্রত্যাশিত ফোন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে হাঁটুর চোটে পড়া যশপ্রীত বুমরা সেরে উঠতে না পারায় শ্রীলঙ্কা সফরের টেস্ট দল থেকে ছিটকে গেলে তার স্থান হয় ২৯ বছর বয়সী আকিব নবীর।

পারভেজ রসুল ও উমরান মালিকের পর নবী হলেন জম্মু ও কাশ্মীর থেকে সিনিয়র ভারতীয় দলে আমন্ত্রণ পাওয়া তৃতীয় খেলোয়াড়। তবে লাল বলের (টেস্ট) ক্রিকেটে তিনিই প্রথম। অভিষেক হলে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়বেন। ১৫ আগস্ট গলে শুরু হতে যাওয়া দুই টেস্টের সিরিজের আগে ৭ আগস্ট কলম্বোয় তিন দিনের একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা হবে। দ্বিতীয় টেস্ট ২৩ আগস্ট কলম্বেয় অনুষ্ঠিত হবে।