চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গত ২৬ জুন একটি ছোট বিমান একটি আকাশচুম্বী ভবনে আঘাত হানার ঘটনার রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। ওই দিন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে পূর্ব থার্ড রিং রোডের নিকটবর্তী একটি সুউচ্চ স্থাপনায় বিধ্বস্ত হয় দুই আসনবিশিষ্ট এক ইঞ্জিনের স্পোর্টস উড়োজাহাজটি। এতে পাইলট নিহত এবং বিমানের বাইরে থাকা আরও ১৩ জন আহত হন। কিন্তু ঘটনার সাতদিন পার হলেও কর্তৃপক্ষ এখনো কেন এই বিমানটি চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল আকাশসীমায় প্রবেশ করল, সেই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
দুর্ঘটনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত ভবনটির পরিচয়ও নিশ্চিত করতে বেইজিং পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণ ও ঘটনাস্থলের ছবি-ভিডিওর ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভবনটি হচ্ছে সিআইটিআইসি টাওয়ার, যা চায়না জুন নামেও পরিচিত। ৫২৮ মিটার উঁচু এই ১০৮ তলাবিশিষ্ট স্থাপনা বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবন এবং শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত। কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে ভবনের নাম উল্লেখ না করে শুধু ‘চাওইয়াং জেলার একটি সুউচ্চ ভবন’ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। ভবনের ওপরের দিকের কাচের দেয়ালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, যেখানে দুটি বড় এক্সটেরিয়র প্যানেল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য পর্যালোচনা করে রয়টার্স জানতে পেরেছে, বিমানটির নিবন্ধন নম্বর ছিল ‘বি-১২পিপি’। এটি বেইজিংয়ের শিফোসি বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে শহরের কেন্দ্রের দিকে পশ্চিমমুখী পথে যাত্রা শুরু করেছিল। চাওইয়াং এলাকায় পৌঁছানোর পর রাডার থেকে এর সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ রেকর্ডকৃত অবস্থান ছিল সিআইটিআইসি টাওয়ার থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে। তবে কর্তৃপক্ষের দেওয়া দুর্ঘটনার আনুষ্ঠানিক সময় ও ফ্লাইটরাডার২৪-এর সর্বশেষ ট্র্যাকিংয়ের সময়ের মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই একই সময় উল্লেখ থাকলেও টাওয়ার থেকে দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। বিমানটির গতিবেগ ও দূরত্বের হিসাব অনুযায়ী, রাডার থেকে সিগন্যাল হারানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই এটি টাওয়ারের কাছে পৌঁছাতে পারত। সময়ের এই অসঙ্গতি নিয়ে বেইজিং পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে মন্তব্য চাইলে তারা কোনো জবাব দেয়নি।
দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ প্রথমে শুধু পাইলটের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। প্রায় এক সপ্তাহ পর চাওইয়াং এলাকার কর্তৃপক্ষ জানায়, পাইলট হলেন ৬৬ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা লিউ। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, লিউ দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা ও হতাশায় ভুগছিলেন এবং তাঁর ডায়েরিতে বারবার আত্মহত্যার কথা উল্লেখ ছিল। কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যক্তিগত কারণেই তিনি তাঁর অনুমোদিত আকাশসীমা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভবনে ধাক্কা মারেন। বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল চীনে তৈরি ‘সানওয়ার্ড অরোরা এসএ৬০এল’ মডেলের দুই আসনবিশিষ্ট এক ইঞ্জিনের স্পোর্টস বিমান, যার সর্বনিম্ন উড্ডয়ন গতি ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার। বিমানের ধ্বংসাবশেষে ‘বি-১২পিপি’ রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখা গেছে।
ঘটনাটি চীনের দ্রুত সম্প্রসারণশীল স্বল্প উচ্চতার বিমান চলাচল (লো-অলটিটিউড এভিয়েশন) খাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর কিছু পর্যটন ফ্লাইট অপারেটর ও এভিয়েশন কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার অপেক্ষায় তাদের সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। তদন্তের সময় কর্তৃপক্ষ নতুন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করবে কি না, তা নিয়ে খাতটিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এছাড়া, দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তে হাইনান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭১৪৬ বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দুটি বিমানের মধ্যে উচ্চতার ব্যবধান ছিল মাত্র এক হাজার ফুটের কিছু বেশি। ওই সময় হাইনান এয়ারলাইন্সের বিমানটি হঠাৎ করে নিজের উচ্চতা বাড়িয়ে নেয় এবং উড্ডয়নের পথ পরিবর্তন করে। এই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে বিমানবন্দর ও হাইনান এয়ারলাইন্সের কাছে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চললেও কর্তৃপক্ষের অনলাইন পোস্টগুলো দ্রুত মুছে ফেলা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি বেইজিং কর্তৃপক্ষ।




