বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে ‘দ্য বিটলস’ একটি অনন্য নাম। জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টার—এই চার শিল্পীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংগীতের এই অধ্যায়টি কালজয়ী। ব্যান্ডটির ক্যারিয়ারে ২২ আগস্ট তারিখটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভিন্ন ভিন্ন বছরের এই দিনে ঘটেছিল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রথম টেলিভিশন পারফরম্যান্স থেকে শুরু করে রিঙ্গো স্টারের সাময়িক বিদায় এবং ব্যান্ডের শেষ ফটোসেশন—২২ আগস্ট যেন বিটলসের উত্থান, অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও সমাপ্তির সাক্ষী।
১৯৬২ সালের ২২ আগস্ট লিভারপুলের ম্যাথিউ স্ট্রিটের ক্যাভার্ন ক্লাবে দুপুরের পরিবেশনা করছিল বিটলস। এটি ছিল ক্লাবটিতে তাদের ১২৬তম দুপুরের অনুষ্ঠান। তবে এই দিনটি বিশেষ হয়ে ওঠে কারণ এই প্রথম ব্যান্ডটির পরিবেশনা টেলিভিশন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। দর্শকদের বিপুল সাড়া পাওয়ার পর ম্যানচেস্টারভিত্তিক গ্রানাডা টেলিভিশন বিটলসের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর আগে ২৬ জুলাই সাউথপোর্টের কেমব্রিজ হলে তাদের পরিবেশনা দেখেছিলেন গ্রানাডার প্রযোজকরা, পরে তারা ক্যাভার্ন ক্লাবেও আসেন। ২২ আগস্ট সেখানে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয় গ্রানাডার দল। সেদিন বিটলস ‘সাম আদার গাই’ গানটি পরিবেশন করে। ব্যান্ডে তখন সদ্য যোগ দিয়েছিলেন রিঙ্গো স্টার; মাত্র কয়েক দিন আগে পিট বেস্টকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ধারণ করা ভিডিওতে গান শেষ হওয়ার পর দর্শকদের মধ্যে থেকে একজনকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘উই ওয়ান্ট পিট!’ সেই সময় ফুটেজটির মান খারাপ মনে হওয়ায় এটি সম্প্রচারের অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় এবং সংরক্ষণ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে বিটলস বিশ্বখ্যাত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালের ৬ নভেম্বর গ্রানাডার ‘সিন অ্যাট সিক্স থার্টি’ অনুষ্ঠানে ফুটেজটি প্রথম প্রচারিত হয়, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
১৯৬৬ সালের ২২ আগস্ট উত্তর আমেরিকা সফরের অংশ হিসেবে আগের রাতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছিল বিটলস। বিশ্রামের দিনেও তাদের ওয়ারউইক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে হয়। সেখানে নানা ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হন চার সদস্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জন লেনন বলেন, ‘আমরা এটা পছন্দ করি না। আমরা যুদ্ধ পছন্দ করি না।’ জর্জ হ্যারিসনও বলেন, ‘যুদ্ধ অন্যায়, এটা স্পষ্ট।’ ধর্ম নিয়ে লেননের বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি আগেই যথেষ্ট বলেছেন এবং বারবার একই কথা বলতে চান না। পল ম্যাককার্টনি তখন আমেরিকায় এ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বিটলসের সংগীত নিয়েও আলোচনা হয়—‘রিভলভার’ অ্যালবামে বেহালা ও ট্রাম্পেট ব্যবহারের কারণ, ‘ইয়েলো সাবমেরিন’ গানের অর্থ, বব ডিলানের প্রভাব, ভারতীয় সংগীত এবং ভবিষ্যতে আলাদা গান রেকর্ড করার পরিকল্পনা। জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে জন লেননের রসাত্মক উত্তর ছিল, ‘তাতে কিছু যায় আসে না।’ জর্জ হ্যারিসন জানান, যারা সত্যিই তাদের পছন্দ করেন, তারা থাকলেই তারা খুশি। এই সংবাদ সম্মেলনটি শুধু প্রচারণামূলক ছিল না, বরং বিটলসের চিন্তাভাবনা ও তখনকার সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল।
১৯৬৮ সালের ২২ আগস্ট বিটলসের ইতিহাসে এক বড় সংকটের দিন। ‘হোয়াইট অ্যালবাম’ রেকর্ডিংয়ের সময় ব্যান্ডের ভেতরের টানাপোড়েন বাড়ছিল। সেদিন রিঙ্গো স্টার ব্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অ্যাবে রোডের স্টুডিও টুতে সন্ধ্যা সাতটা থেকে পরদিন ভোর চারটা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত রেকর্ডিং চলেছিল। পল ম্যাককার্টনির ‘ব্যাক ইন দ্য ইউএসএসআর’ গানটির মহড়ার সময় বিরোধের সূত্রপাত। রিঙ্গোর মনে হচ্ছিল তাঁর বাজানো ভালো হচ্ছে না, এবং জন, পল ও জর্জ নিজেদের মধ্যে বেশি ঘনিষ্ঠ; তিনি যেন দলের বাইরের একজন। রিঙ্গো প্রথমে জন লেননকে জানান, তিনি ব্যান্ড ছেড়ে দিচ্ছেন। জনের উত্তর ছিল, ‘আমি ভেবেছিলাম তোমরা তিনজন!’ একই কথা পল ম্যাককার্টনিকেও জানালে পলের উত্তরও প্রায় একই ছিল। এরপর রিঙ্গো সন্তানদের নিয়ে সার্ডিনিয়ায় ছুটিতে যান, অভিনেতা পিটার সেলার্সের ধার করা ইয়টে। সেখানেই ‘অক্টোপাসেস গার্ডেন’ গানটির ভাবনা জন্ম নেয়, সমুদ্রের অক্টোপাসের জীবন নিয়ে ইয়টের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার পর। রিঙ্গোর অনুপস্থিতিতে বিটলস ‘ব্যাক ইন দ্য ইউএসএসআর’ রেকর্ডিং চালিয়ে যায়; পল ড্রাম, জর্জ গিটার ও জন বেস বাজান। তবে কয়েক দিন পর রিঙ্গোর কাছে টেলিগ্রাম যায়—‘তুমিই বিশ্বের সেরা রক অ্যান্ড রোল ড্রামার। ফিরে এসো, আমরা তোমাকে ভালোবাসি।’ ফিরে এসে রিঙ্গো দেখেন, জর্জ হ্যারিসন তাঁর ড্রামসহ পুরো স্টুডিও ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন এবং সেখানে লেখা রয়েছে, ‘ওয়েলকাম ব্যাক রিঙ্গো।’
১৯৬৯ সালের ২২ আগস্ট টিটেনহার্স্ট পার্কে বিটলসের চার সদস্যের শেষ ফটোসেশন অনুষ্ঠিত হয়। তখন তারা ‘অ্যাবি রোড’ অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষ করেছে। ব্যান্ডের ভেতরে টানাপোড়েন চললেও সেদিন চারজন একসঙ্গে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। কটেজ ও মূল বাড়ির মাঝের পথ, মূল বাড়ির ভেতরের বড় কাঠের টেবিলের পাশ এবং বাড়ির দক্ষিণ বারান্দায় ছবি তোলা হয়। ফটোগ্রাফার ইথান রাসেলের তোলা এই সেশনের কয়েকটি ছবি পরে বিটলসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে ওঠে। এর মধ্যে তিনটি ছবি ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত ‘হেই জুড’ সংকলন অ্যালবামের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬২ সালে প্রথম টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়া থেকে ১৯৬৯ সালে শেষবার একসঙ্গে ফটোসেশনে দাঁড়ানো—এই সাত বছরের ব্যবধানে ফুটে ওঠে ব্যান্ডটির উত্থান, বিশ্বজয়, অভ্যন্তরীণ সংকট ও সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। ১৯৭০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিটলস ভেঙে যাওয়ার কয়েক মাস আগে তোলা এই ছবিগুলো আজ সংগীতের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় দলিল।




